মিথ্যা ধর্ষণ মামলায় জড়িয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং কারাবাসের পর ডিএনএ পরীক্ষায় সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারলেন না ফেনীর আলোচিত ইমাম মাওলানা মুজাফফর আহমদ জুবায়ের। উল্টো সামাজিক হেনস্তা, তীব্র মানসিক যন্ত্রণা ও অপমানের ক্ষত বইতে না পেরে তিনি পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। বর্তমানে রাজধানীর আদাবরের একটি বেসরকারি বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মিথ্যা মামলার পর থেকেই তিনি চরম বিষণ্নতায় ভুগছিলেন এবং এর আগে কারাগারে থাকা অবস্থাতেও একবার দেয়ালে মাথা ঠুকে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও সেই মানসিক ট্রমা তিনি কোনোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য-সচিব তারেক রেজার ছোট ভাই ইমনের বাসায় অবস্থানকালে আচমকাই তীব্র আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন মাওলানা জুবায়ের। এ সময় তিনি ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন এবং উপস্থিত লোকজনের ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ইনজেকশন দেওয়ার পর তার অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হয়। তবে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং আইনি অভিভাবক তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থিত না থাকায় রাতে তাকে সেখানে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি।
পরদিন শুক্রবার সকালে ফেনী থেকে তার বাবা-মা ঢাকায় পৌঁছালে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে আদাবরের ‘এনলাইটেনড সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে’ ভর্তি করা হয়। মাওলানা জুবায়েরের এই চরম সংকটে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাইদুল আশরাফ কুশল। তিনি এই অসহায় ইমামকে আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার সদয় ঘোষণা দিয়েছেন। এনসিপির সম্প্রীতি সেলের সমন্বয়ক তারেক রেজা এই ঘটনাকে চরম ট্র্যাজেডি উল্লেখ করে বলেন, একজন সম্পূর্ণ নির্দোষ ও ধর্মপ্রাণ ইমামকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সমাজ তিল তিল করে ধ্বংস করে দিয়েছে। এই তীব্র সামাজিক চাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা থেকেই তিনি আজ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ফেনীর পরশুরামে এক মক্তবপড়ুয়া কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের নভেম্বরে স্থানীয় রাজনৈতিক রোষানল ও ষড়যন্ত্রের শিকার হন মাওলানা জুবায়ের। তার বিরুদ্ধে একটি স্পর্শকাতর ধর্ষণ মামলা করা হয় এবং তাকে ৩২ দিন কারাভোগ করতে হয়। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষা করা হলে পুরো বিষয়টি নাটকীয় মোড় নেয়। ডিএনএ রিপোর্টে প্রমাণিত হয়, ওই কিশোরীর সন্তানের জৈবিক পিতা মাওলানা জুবায়ের নন, বরং কিশোরীর নিজের আপন ভাই। ২০২৫ সালের ১৯ মে অভিযুক্ত ভাই আদালতে এই বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন।
আদালতের মাধ্যমে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও ততদিনে জুবায়েরের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে, গত শনিবার (৯ মে) ফেনী রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক আবেগঘন সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই ইমাম। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট আসার আগেই কোনো ধরনের কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই তাকে মসজিদের ইমামতি এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
Leave a comment