Home সাম্প্রতিক বিয়ের রাতেই স্ত্রীকে রেখে পালিয়েছিলেন নজরুল, ১৬ বছর পর চিঠিতে কী লিখেছিলেন
সাম্প্রতিক

বিয়ের রাতেই স্ত্রীকে রেখে পালিয়েছিলেন নজরুল, ১৬ বছর পর চিঠিতে কী লিখেছিলেন

Share
Share

১৯২১ সালের ১৮ জুন কুমিল্লার দৌলতপুরের সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিসের সঙ্গে বিয়ে হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের। নার্গিসের পরিবার থেকে  নজরুলকে শর্ত দেওয়া হয়েছিল বিয়ের পর ঘর জামাই থাকতে। এই শর্ত শুনে বিয়ের রাতেই স্ত্রীকে রেখে পালিয়ে যান নজরুল। মাঝে নার্গিস বেশ কয়েকবার চিঠি পাঠালেও কবি তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি। তবে বিয়ের দীর্ঘ ১৬ বছর পর নার্গিসকে চিঠি পাঠান নজরুল। এটিই নার্গিসকে পাঠানো তার প্রথম ও শেষ চিঠি।

পাঠকদের জন্য নার্গিসকে লেখা কাজী নজরুলের সেই চিঠিটি হুবহু তুলে ধরা হলো

১০৬ আপার চিৎপুর রোড

“গ্রামোফোন রিহার্সাল রুম”

কলকাতা, ০১/০৭/১৯৩৭

কল্যানীয়াসু,

তোমার পত্র পেয়েছি সেদিন নব বর্ষার নবঘন-সিক্ত প্রভাতে। মেঘ মেদুর গগনে সেদিন অশান্ত ধারায় বারি ঝরছিল। পনের বছর আগে এমনি এক আষাঢ়ে এমনি এক বারিধারায় প্লাবন নেমেছিল, তা তুমিও হয়তো স্মরণ করতে পারো। আষাঢ়ের নব মেঘপুঞ্জকে আমার নমস্কার। এই মেঘদূত বিরহী যক্ষের বাণী বহন করে নিয়ে গিয়েছিল কালিদাসের যুগে, রেবা নদীর তীরে, মালবিকার দেশে, তার প্রিয়ার কাছে। এই মেঘপুঞ্জের আশীর্বাণী আমার জীবনে এনে দেয় চরম বেদনার সঞ্চার।

এই আষাঢ় আমায় কল্পনার স্বর্গলোক থেকে টেনে ভাসিয়ে দিয়েছে বেদনার অনন্ত স্রোতে। যাক, তোমার অনুযোগের অভিযোগের উত্তর দেই। তুমি বিশ্বাস করো, আমি যা লিখছি তা সত্য। লোকের মুখে শোনা কথা দিয়ে যদি আমার মূর্তির কল্পনা করে থাক,তাহলে আমায় ভুল বুঝবে- আর তা মিথ্যা।

তোমার উপর আমি কোনো ‘জিঘাংসা’ পোষণ করি না — এ আমি সকল অন্তর দিয়ে বলছি। আমার অন্তর্যামী জানেন তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কী গভীর ক্ষত, কি আসীম বেদনা! কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি, তা দিয়ে তোমায় কোনোদিন দগ্ধ করতে চাইনি। তুমি এই আগুনের পরশমানিক না দিলে আমি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতাম না। আমি ধুমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না।

তোমার যে কল্যাণ রূপ আমি আমার কিশোর বয়সে প্রথম দেখেছিলাম, যে রূপকে আমার জীবনের সর্বপ্রথম ভালবাসার  অঞ্জলি দিয়েছিলাম, সে রূপ আজও স্বর্গের পারিজাত-মান্দারের মতো চির অম্লান হয়েই আছে আমার বক্ষে। অন্তরের সে আগুন-বাইরের সে ফুলহারকে স্পর্শ করতে পারেনি।

তুমি ভুলে যেওনা আমি কবি, আমি আঘাত করলেও ফুল দিয়ে আঘাত করি। অসুন্দর কুৎসিতের সাধনা আমার নয়। আমার আঘাত বর্বরের কাপুরুষের আঘাতের মতো নিষ্ঠুর নয়। আমার অন্তর্যামী জানেন (তুমি কি জানো বা শুনেছ জানিনা) তোমার বিরুদ্ধে আজ আমার কোন অনুযোগ নেই, অভিযোগ নেই, দাবীও নেই।

তোমার আজিকার রূপ কী জানি না। আমি জানি তোমার সেই কিশোরি মুর্তিকে, যাকে দেবীমূর্তির মতো আমার হৃদয় বেদীতে অনন্ত প্রেম, অনন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। সেদিনের তুমি সে বেদী গ্রহণ করলেনা। পাষাণ দেবীর মতই তুমি বেছে নিলে বেদনার বেদিপাঠ …জীবন ভ’রে সেখানেই চলেছে আমার পূজা আরতি। আজকার তুমি আমার কাছে মিথ্যা,ব্যর্থ ; তাই তাকে পেতে চাইনে। জানিনে হয়ত সে রূপ দেখে বঞ্চিত হব,অধিকতর বেদনা পাব, তাই তাকে অস্বীকার করেই চলেছি।

দেখা? না-ই হলো এ ধূলির ধরায়। প্রেমের ফুল এ ধূলিতলে হয়ে যায় ম্লান, দগ্ধ, হতশ্রী। তুমি যদি সত্যিই আমায় ভালবাস আমাকে চাও ওখান থেকেই আমাকে পাবে। লাইলি মজনুকে পায়নি, শিরি ফরহাদকে পায়নি, তবু তাদের মত করে কেউ কারো প্রিয়তমাকে পায়নি। আত্মহত্যা মহাপাপ, এ অতি পুরাতন কথা হলেও প্রেম সত্য। আত্মা অবিনশ্বর,আত্মাকে কেউ হত্যা করতে পারেনা। প্রেমের সোনার কাঠির স্পর্শ যদি পেয়ে থাকো, তাহলে তোমার মতো ভাগ্যবতী আর কে আছে ? তারি মায়া স্পর্শে তোমার সকল কিছু আলোয় আলোময় হয়ে উঠবে।

দুঃখ নিয়ে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে গেলেই সেই দুঃখের অবসান হয় না। মানুষ ইচ্ছা করলে সাধনা দিয়ে, তপস্যা দিয়ে ভুলকে ফুল রূপে ফুটিয়ে তুলতে পারে। যদি কোনো ভুল করে থাক জীবনে, এই জীবনেই তাকে সংশোধন করে যেতে হবে; তবেই পাবে আনন্দ মুক্তি; তবেই হবে সর্ব দুঃখের অবসান। নিজেকে উন্নত করতে চেষ্টা করো, স্বয়ংবিধাতা তোমার সহায় হবেন। আমি সংসার করছি, তবু চলে গেছি এই সংসারের বাধাকে অতক্রম করে উর্ধ্ব লোকে। সেখানে গেলে পৃ্থিবীর সকল অপূর্ণতা, সকল অপরাধ ক্ষমা সুন্দর চোখে পরম মনোহর মূর্তিতে দেখা যায়।…

হঠাৎ মনে পড়ে গেল পনের বছর আগের কথা। তোমার জ্বর হয়েছিল, বহু সাধনার পর আমার তৃষিত দুটি কর তোমার শুভ্র ললাট স্পর্শ করতে পেরেছিল; তোমার তপ্ত ললাটের স্পর্শ যেন আজও অনুভব করতে পারি। তুমি কি চেয়ে দেখেছিলে? আমার চোখে ছিল জল, হাতে সেবা করার আকুল স্পৃহা, অন্তরে শ্রীবিধাতার চরণে তোমার আরোগ্য লাভের জন্য করুন মিনতি। মনে হয় যেন কালকের কথা। মহাকাল যে স্মৃতি মুছে ফেলতে পারলেন না। কী উদগ্র অতৃপ্তি, কী দুর্দমনীয় প্রেমের জোয়ারই সেদিন এসেছিল। সারা দিন রাত আমার চোখে ঘুম ছিল না।

যাক আজ চলেছি জীবনের অস্তমান দিনের শেষে রশ্মি ধরে ভাটার স্রোতে, তোমার ক্ষমতা নেই সে পথ থেকে ফেরানোর। আর তার চেষ্টা করো না। তোমাকে লেখা এই আমার প্রথম ও শেষ চিঠি হোক। যেখানেই থাকি বিশ্বাস করো আমার অক্ষয় আশীর্বাদ কবচ তোমায় ঘিরে থাকবে। তুমি সুখি হও, শান্তি পাও, এই প্রার্থনা। আমায় যত মন্দ বলে বিশ্বাস করো, আমি তত মন্দ নই, এই আমার শেষ কৈফিয়ৎ।

ইতি
নিত্য শুভার্থী
নজরুল ইসলাম

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

ইরান যুদ্ধের ৪০ দিনে ৪২ বিমান হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury)-তে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী। প্রায় ৪০ দিনের এই সশস্ত্র...

স্কুল চেয়ারম্যানের ‘অপমানে’ দশম শ্রেণির ছাত্রীর আত্মহত্যা: বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

রাজধানীর দনিয়া এলাকার ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবিকুন নাহার নামের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। অভিযোগ...

Related Articles

কুষ্টিয়ায় বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ২৫

কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শিমুলিয়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ জন নিহত...

রমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে; দাবি ট্রাম্পের

হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড...

ডাকাতেরা যখন মুখ চেপে ধরেছিল, তখন মনে মনে শুধু বলছিলাম, ‘আল্লাহ আমাকে অসম্মানিত কইরো না’

রাজধানীর একটি বাসায় ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনায় আহত হয়েছেন এক স্কুলশিক্ষিকা ও তাঁর...

প্রকাশ্যে এলো রামিসার ধর্ষক ও হত্যাকারী সোহেলের যত অপকর্ম

রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার...