ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury)-তে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী। প্রায় ৪০ দিনের এই সশস্ত্র সংঘাতে ওয়াশিংটন তাদের অন্তত ৪২টি সামরিক আকাশযান হারিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক স্টেলথ ফাইটার জেট, বোমারু বিমান, ড্রোন এবং নজরদারি বিমান। মার্কিন কংগ্রেসের নিজস্ব গবেষণা সংস্থা ‘কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস’ (CRS)-এর সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ দেড় দশকের টানাপোড়েনের পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (CENTCOM) ইরানে এই বিশেষ অভিযান শুরু করে। গত ৭ এপ্রিল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর, ৮ এপ্রিল দুই পক্ষ এক আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে।
পেন্টাগন বা মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কৌশলগত কারণে এখন পর্যন্ত যুদ্ধের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জনসমক্ষে প্রকাশ না করলেও, সিআরএস গণমাধ্যম ও সেন্টকমের অভ্যন্তরীণ বিবৃতির ওপর ভিত্তি করে এই পূর্ণাঙ্গ তালিকাটি তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ৪২টি বিমান ও ড্রোনের সম্মিলিত আর্থিক মূল্য প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি (২৯ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের হারিয়ে যাওয়া সামরিক যানগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশ্বখ্যাত ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল কিছু যুদ্ধবিমান। প্রতিবেদনে ধ্বংস হওয়া ৪২টি উড়োজাহাজের যে তালিকা দিয়েছে সিআরএস, এ তালিকায় রয়েছে ৪টি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল ফাইটার জেট, একটি এফ-৩৫এ লাইটনিং ২ স্টেলথ ফাইটার, একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট ২ অ্যাটাক এয়ারক্র্যাফট, ৭টি কেসি-১৩৫ স্টার্টোট্যাংকার রি-ফুয়েলিং উড়োজাহাজ, একটি ই-৩ সেন্ট্রি এওাকস সার্ভেইলেন্স এয়ারক্রাফট, ২টি এমসি-১৩০ জে কমান্ডো ২ এয়ারক্রাফট স্পেশাল অপারেশন এয়ারক্রাফট, একটি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ জলি গ্রিন রেসকিউ হেলিকপ্টার, ২৪টি এমকিউ-৯ রিঅ্যাপেয়ার ড্রোন এবং একটি এমকিউ-৪সি ট্রাইটন হাই-অল্টিচ্যুড সার্ভেইলেন্স ড্রোন। ধ্বংস হওয়া এসব উড়োজাহাজ এবং বিমানের মূল্য প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলার।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই তালিকায় থাকা পঞ্চম প্রজন্মের ‘এফ-৩৫এ স্টেলথ ফাইটার’ হারানোর বিষয়টি মার্কিন বিমানবাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা। ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের সশস্ত্র বাহিনীই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো মার্কিন এফ-৩৫ ফাইটার জেট গুলি করে ভূপাতিত করার গৌরব অর্জন করেছে। এছাড়া ধ্বংস হওয়া ৪টি এফ-১৫ই বিমানের মধ্যে ৩টি কুয়েতের আকাশে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বা নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির কারণে বিধ্বস্ত হয় বলে সেন্টকম সূত্রে জানা গেছে।
সিআরএস-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানের মূল ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল দুটি—ইরানের বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং দেশটির কাছে থাকা আনুমানিক ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া।
অভিযানের প্রথম দিনই মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সপরিবারে নিহত হন এবং পরবর্তী দিনগুলোতে দেশটির প্রথম সারির বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তা প্রাণ হারান। তবে চরম রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংকটের মাঝেও ইরানের শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ফলে দীর্ঘ ৪০ দিনের তীব্র বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে; অর্থাৎ ইরানের সরকার উচ্ছেদ করা যায়নি এবং মার্কিন বাহিনী এখন পর্যন্ত ইরানের গোপন ইউরেনিয়াম মজুতের সুনির্দিষ্ট অবস্থানও শনাক্ত করতে পারেনি।
পেন্টাগনের পক্ষ থেকে বাজেট ও যুদ্ধব্যয় নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের (এমপি) দীর্ঘদিনের চাপের মুখে সম্প্রতি ভারপ্রাপ্ত পেন্টাগন কমপট্রোলার জুলস ডব্লিউ হার্স্ট এক শুনানিতে স্বীকার করেছেন যে, ইরানের এই অভিযানে মার্কিন সামরিক ব্যয় প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে, যার একটি বড় অংশই গেছে নষ্ট হওয়া সামরিক সরঞ্জাম মেরামত ও নতুন করে প্রতিস্থাপনের পেছনে। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ মার্কিন বিমানবাহিনীর সক্ষমতা এবং তাদের আকাশযানের সুরক্ষাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে বলে মনে করছে কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস।
Leave a comment