“আমি যখন সন্দেহবশত ওই ফ্ল্যাটের দরজায় নক করছিলাম, তখন ভেতর থেকে একটা চিৎকার শুনেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমি তখনো বুঝতে পারিনি ওই বুকফাটা আর্তনাদটি আমার নিজের কন্যাসন্তান রামিসার ছিল। ভেবেছিলাম পাশের ফ্ল্যাটের অন্য কোনো বাচ্চা হয়তো চিল্লাপাল্লা করছে।”— রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে খুন হওয়া সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারের নিখোঁজ হওয়া ও হত্যাকাণ্ডের সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তার মা পারভীন আক্তার।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া এক বিশেষ ও একান্ত সাক্ষাৎকারে নিহত রামিসার মা ঘটনার দিন সকালের সেই লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন।
পারভীন আক্তার জানান, গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে তিনি ছোট মেয়ে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। রামিসাকে দ্রুত দাঁত ব্রাশ করে মুখ ধুয়ে স্কুলের পোশাক পরে নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি । মায়ের কথা শুনে রামিসা পাশের ঘরে ব্রাশ করতে যায়। ঠিক ওই সময়েই রামিসার বড় বোন পাশের ভবনে তার চাচার বাসায় যাচ্ছিল। রামিসাও বড় বোনের পেছনে পেছনে যাওয়ার বায়না ধরলে বড় বোন তাকে এই মুহূর্তে না গিয়ে বাসায় থাকার কথা বলে দরজা পেরিয়ে চলে যায়। রামিসা তখনো নিজেদের ফ্ল্যাটের মূল দরজার ভেতরেই অবস্থান করছিল। কিন্তু বড় বোন চোখের আড়াল হওয়া মাত্রই রামিসা পুনরায় তার পেছনে যাওয়ার জন্য বাইরে পা বাড়ায়। আর ঠিক তখনই ওত পেতে থাকা উল্টো দিকের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা তাকে টেনে হিঁচড়ে নিজের ঘরের ভেতর নিয়ে যায়।
নিহত শিশুর মা বলেন, “হঠাৎ লক্ষ্য করি রামিসা ঘরে নেই। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ও কোথায় গেল তা দেখতে আমি বাইরে আসি। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে ঠিক উল্টো দিকের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রামিসার একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখি। এর কিছুক্ষণ পর দেখি ওর বড় বোন চাচার বাসা থেকে একাই ফিরে আসছে। তখন আমার মনে তীব্র সন্দেহের দানা বাঁধে। আমি ওই বন্ধ ফ্ল্যাটের দরজায় জোরে জোরে নক করতে থাকি। তখনই ভেতর থেকে একটা বাচ্চার চিৎকার আমার কানে আসে। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি যে আমার মেয়েকে ভেতরে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, সন্দেহ গভীর হওয়ার পর তিনি বারবার দরজায় ধাক্কা দিলেও ভেতর থেকে কেউ সাড়া দেয়নি এবং দরজা খোলেনি। অভিযুক্ত দম্পতির পরিচয় সম্পর্কে পারভীন আক্তার বলেন, “ওই দম্পতি মাত্র দুই মাস আগে এই ফ্ল্যাটে ভাড়া এসেছিল। ওই পুরুষের (মূল আসামি) সঙ্গে আমাদের তেমন কোনো পরিচয় কিংবা কখনো কথা হয়নি।”
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার সকালে মিরপুরের পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট থেকে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তীতে তল্লাশি চালিয়ে ওই ফ্ল্যাটের বাথরুমের একটি বালতি থেকে শিশুটির খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করা হয়।
এই বর্বরোচিত ঘটনার পর জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে পুলিশ দ্রুত অভিযানে নামে। ঘটনার পরপরই মূল আসামি সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়, যে মূলত স্বামীকে পালাতে সাহায্য করতে দীর্ঘক্ষণ দরজা খোলেনি। পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশ ও আদালত সূত্র নিশ্চিত করেছে, শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে নৃসংশভাবে হত্যার কথা স্বীকার করে ইতিমধ্যেই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে ঘাতক সোহেল রানা। এই অবর্ণনীয় নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এবং অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির দাবিতে আজো রাজধানীসহ সারা দেশে ক্ষোভে ফুঁসছে সর্বস্তরের জনতা।
Leave a comment