জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ছয় মাস ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। বকেয়া রয়েছে ঈদ বোনাস ও ওভারটাইমের অর্থও। সব মিলিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাওনা প্রায় ৯২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অফিস ভাড়া, রক্ষণাবেক্ষণ, ইউটিলিটি বিল ও বিভিন্ন পণ্য-সেবা সরবরাহকারীদের আরও প্রায় ৪১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়নি।
দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে ইতিমধ্যে ৭০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ফাউন্ডেশন। এদিকে জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের প্রতিশ্রুত সহায়তা দিতে আরও প্রায় ২৬৩ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর।
ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে অর্থসহায়তা চেয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়ে গত ২৯ জুলাই, ৩ আগস্ট ও ১০ আগস্ট তিন দফা চিঠি দেওয়া হলেও এখনো সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে ফাউন্ডেশন।
ছয় মাস ধরে বেতন-ভাতা বকেয়া
ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে ওভারটাইমের অর্থ ও ঈদ বোনাসও বকেয়া রয়েছে।
ছয় মাসে মূল বেতন বাবদ বকেয়া হয়েছে প্রায় ৭৮ লাখ টাকা। ঈদ বোনাস ৬ লাখ ৫০ হাজার এবং অন্যান্য বোনাস ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাওনা প্রায় ৯২ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
অফিস ভাড়া, মেইনটেন্যান্স ফি, ইউটিলিটি বিল ও বিভিন্ন পণ্য-সেবা সরবরাহকারীদের পাওনা মিলিয়ে আরও প্রায় ৪১ লাখ টাকা বকেয়া হয়েছে। এর মধ্যে অফিস ভাড়া ৩৩ লাখ, ইউটিলিটি বিল ৪ লাখ এবং ভেন্ডর পেমেন্ট দেড় লাখ টাকা। গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারের নবায়ন বাবদও আড়াই লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। অর্থসংকটের কারণে সফটওয়্যারটি নবায়ন করা যায়নি বলে জানিয়েছে ফাউন্ডেশন।
দৈনন্দিন খরচ মেটাতে এ পর্যন্ত ৭০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফাউন্ডেশনের মূল তহবিল থেকে গভর্নিং বডির অনুমোদন নিয়ে ৬০ লাখ টাকা এবং সিইও কামাল আকবর ব্যক্তিগতভাবে ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
সহায়তা দিতে প্রয়োজন আরও ২৬৩ কোটি টাকা
জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের জরুরি আর্থিক সহায়তা দিতে মোট ৩৬৩ কোটি টাকা প্রয়োজন ছিল বলে জানিয়েছে ফাউন্ডেশন। এর বিপরীতে অন্তর্বর্তী সরকারের ত্রাণ তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকাসহ বিভিন্ন উৎস থেকে মোট ১২৫ কোটি টাকা অনুদান পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ৮৩১ শহীদ পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ৪২ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। আর ৬ হাজার ১২৭ আহত জুলাই যোদ্ধাকে শ্রেণিভেদে দেওয়া হয়েছে মোট ৭৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে জরুরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে ১২১ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
ফাউন্ডেশনের হিসাবে, প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা অবশিষ্ট রয়েছে। এর মধ্যে ৬০ লাখ টাকা জরুরি ব্যয় মেটাতে গভর্নিং বডির অনুমোদনে ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট শহীদ পরিবার ও ৯ হাজার ৭৭৬ আহত জুলাই যোদ্ধাকে সহায়তা দিতে আরও প্রায় ২৬৩ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সিইও কামাল আকবর।
মন্ত্রণালয়ে একাধিক বৈঠক, বাতিল হয়েছে ব্রিফিং
কামাল আকবর বলেন, অর্থসহায়তার বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ১৫টির বেশি চিঠি চালাচালি হয়েছে। গত ছয় মাসে অন্তত পাঁচটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সাত-আটবার আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে।
ফাউন্ডেশনের বর্তমান অবস্থা ও অর্থের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ব্রিফিংয়ের সময় চাওয়া হয়েছিল। অন্তত তিনবার সময় নির্ধারণ করা হলেও পরে ব্রিফিং বাতিল করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
কামাল আকবরের ভাষ্য, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ ও বৈঠকে ফাউন্ডেশনের বকেয়া ও আর্থিক সমস্যার বিষয়টি জানানো হয়েছে। রিইমবার্সমেন্টের বিষয়েও প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
অর্থ মন্ত্রণালয়েও চিঠি
ফাউন্ডেশনের দাবি, বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ছয় মাসে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অন্তত চারটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। পরে অর্থসহায়তা চেয়ে গত ২০ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়েও চিঠি পাঠানো হয়।
কামাল আকবর বলেন, চিঠিগুলোর অগ্রগতি জানতে নিয়মিত যোগাযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অর্থসহায়তা পাওয়া যায়নি।
প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়ে তিন চিঠি
ফাউন্ডেশনের বর্তমান অবস্থা ও অর্থের প্রয়োজন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ২৯ জুলাই, ৩ আগস্ট ও ১০ আগস্ট তিনটি চিঠি দেওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি বলে জানান কামাল আকবর।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয় ও সচিবালয়ে গিয়েও সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন মাধ্যমে ফাউন্ডেশনের সমস্যার কথা জানানোর চেষ্টা করা হলেও সাক্ষাৎ বা সহায়তা—কোনোটিই পাওয়া যায়নি বলে তাঁর দাবি।
সংসদেও বিষয়টি ওঠে
ফাউন্ডেশনের অর্থসংকটের বিষয়টি জাতীয় সংসদেও উত্থাপিত হয়েছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে চিঠি দেওয়ার পর তিনি সংসদ সদস্যের মাধ্যমে বিষয়টি উত্থাপনের পরামর্শ দেন বলে জানিয়েছে ফাউন্ডেশন।
পরে জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগমের মাধ্যমে বিষয়টি সংসদে উত্থাপিত হয়। সেখানে ফাউন্ডেশনকে সমাজকল্যাণ অথবা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি অর্থসহায়তার দাবি জানানো হয়।
ফাউন্ডেশনের সিইওর দাবি, এ সময় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও বিষয়টি সমর্থন করেন। সরকারদলীয় পর্যায় থেকেও প্রয়োজন মেটানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে এখনো এর বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি বলে জানান তিনি।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ধারণা নিয়ে সিইওর আশঙ্কা
অর্থসহায়তা না পাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কামাল আকবর। তাঁর দাবি, ফাউন্ডেশনকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
কামাল আকবর বলেন, ফাউন্ডেশনের প্রাথমিক পর্যায়ের নেতৃত্বে থাকা কয়েকজন ছাত্রনেতা পরে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ায় এমন ধারণা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে তাঁর দাবি, ফাউন্ডেশনের গঠনতন্ত্রে প্রতিষ্ঠানটিকে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো সদস্য রাজনীতিতে যুক্ত হলে তাঁকে ফাউন্ডেশন থেকে অব্যাহতি নেওয়ার বিধানও রয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া ব্যক্তিরা ইতিমধ্যে ফাউন্ডেশন থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। তাই জুলাই-আগস্টের শহীদ ও আহতদের পরিবারের জন্য ফাউন্ডেশনটি একটি অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম।
সরকারের বক্তব্য
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তর জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করছে। এ কারণে অর্থসহায়তার জন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন।
তবে ফাউন্ডেশনকে কেন অর্থসহায়তা দেওয়া হয়নি এবং নির্ধারিত ব্রিফিং কেন বাতিল করা হয়েছে—এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের বক্তব্য জানতে তাঁর তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শাকিলুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, এ বিষয়ে মন্ত্রী কোনো মন্তব্য করতে চান না। বিষয়টি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের বক্তব্য নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
পরে প্রতিমন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে তাঁর একান্ত সচিব শেখ আরিফুল ইসলাম প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। প্রশ্ন পাঠানোর পর তিনি জানান, প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না।
শেখ আরিফুল ইসলাম বলেন, আগের সরকার কাকে কী দিয়েছে বা দেয়নি, সেটি বর্তমান সরকারের বিষয় নয়। তাঁর ভাষ্য, ফাউন্ডেশনটি একটি এনজিও এবং এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী কোনো মন্তব্য করবেন না।
Leave a comment