বিশ্ব সাপ দিবস উপলক্ষে সাপ সংরক্ষণ ও এর গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতার বার্তা দেওয়া হলেও দেশে এখনো অ্যান্টিভেনম তৈরির কাঁচামালের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অথচ সরকারি নিবন্ধন পাওয়ার পরও থমকে আছে দেশের একমাত্র বাণিজ্যিক সাপের বিষ (স্নেক ভেনম) খামার। উদ্যোক্তার দাবি, সরকারি সহায়তা ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ না থাকায় সম্ভাবনাময় এ উদ্যোগ এগোচ্ছে না।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামে ২০০০ সালে প্রবাসী আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস এ খামার প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘ ২৬ বছর বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে চলতি বছরের এপ্রিলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন পায় খামারটি। এর ফলে বৈধভাবে বিষধর সাপ থেকে বিষ (ভেনম) সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে খামারটিতে কিং কোবরা, কালো গোখরা, পদ্মগোখরা, কালকেউটে, পঙ্খীরাজ, সাদা গোমা, বিষঝুড়ি, পাইথন ও দাঁড়াশসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় আড়াই শত সাপ রয়েছে। নিরাপত্তাবেষ্টিত খাঁচায় সাপগুলোর পরিচর্যা করছেন কর্মীরা।
খামারের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস বলেন, সৌদি আরবে প্রবাসজীবনের সময় তাঁর মাথায় সাপের খামার গড়ে তোলার ধারণা আসে। দেশে ফিরে একটি গোখরা সাপ ও ২০টি ডিম নিয়ে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করেন। এখন খামারে ২৫০টিরও বেশি বিষধর ও অবিষধর সাপ রয়েছে।
তিনি জানান, খামার পরিচালনায় নিজের প্রবাসজীবনের সঞ্চয় এবং পারিবারিক সম্পদ বিক্রি করে এক কোটির বেশি টাকা ব্যয় করেছেন। তবে নিবন্ধন পাওয়ার পরও সরকারিভাবে কোনো আর্থিক বা কারিগরি সহায়তা পাননি। ফলে খামার পরিচালনা, সাপের পরিচর্যা ও নিরাপত্তা ব্যয় বহন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমনকি কর্মীদের নিয়মিত বেতন দিতেও সমস্যা হচ্ছে।
রাজ্জাক বিশ্বাসের দাবি, প্রতি মাসে প্রায় এক পাউন্ড সাপের বিষ সংগ্রহ করা সম্ভব, যার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা। তবে কাঁচা ভেনম সরাসরি বিক্রি করা যায় না। এটি পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাত করে ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করতে হয়। নিবন্ধন পাওয়ার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি।
তিনি বলেন, দেশীয় সাপের বিষ ব্যবহার করে অ্যান্টিভেনম উৎপাদন শুরু হলে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
খামারের কর্মী হৃদয় বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। বিভিন্ন এলাকা থেকে সাপ উদ্ধারের কাজ করে যে পারিশ্রমিক পান, তা দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করছেন।
পটুয়াখালীর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, খামারটিকে ভেনম সংগ্রহের জন্য নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। তবে সংগৃহীত ভেনম সরাসরি বিক্রি করা যাবে না। নির্ধারিত মান ও অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাত করার পরই তা ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা যাবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২৭ লাখ মানুষের শরীরে বিষক্রিয়া দেখা দেয় এবং ৮১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পটুয়াখালী জেলায় সাপের কামড়ে আক্রান্ত ১০২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে জেলায় অ্যান্টিভেনমের ৯০ ভায়াল মজুত রয়েছে।
পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসের সময় উপকূলীয় এলাকায় সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। এসব রোগীর চিকিৎসায় অ্যান্টিভেনম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ, যা বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তিনি বলেন, দেশে সংগৃহীত ভেনম থেকে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের জন্য উন্নত গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত অবকাঠামো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান বলেন, বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে সাপের বিষ সংগ্রহের উদ্যোগ সময়োপযোগী। দেশে উৎপাদিত ভেনম ব্যবহার করে অ্যান্টিভেনম তৈরি করা গেলে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসা আরও সহজ হবে। তবে এ ধরনের খামার পরিচালনায় জৈবনিরাপত্তা, প্রাণিকল্যাণ নীতি, প্রশিক্ষিত জনবল ও সরকারি তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
Leave a comment