কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) দুই শিক্ষার্থীকে তল্লাশির সময় পরিচয় নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় দুই পুলিশ সদস্য ও এক পুলিশ সোর্সকে ছিনতাইকারী সন্দেহে ক্যাম্পাসে নিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর উভয় পক্ষের সম্মতিতে লিখিত সমঝোতার মাধ্যমে ঘটনার নিষ্পত্তি হয়।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যা সাতটার দিকে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ওই দুই পুলিশ সদস্য হলেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) হানিফ ও কনস্টেবল শ্যামল। অপরজন পুলিশ সোর্স জাহিদ।
ভুক্তভোগী দুই শিক্ষার্থী হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ১৮তম ব্যাচের সিফাত হোসেন সিয়াম ও অর্প।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টিউশন শেষে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে রেসকোর্স এলাকায় সিয়াম ও অর্পের পথরোধ করেন তিন ব্যক্তি। তাঁরা নিজেদের পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে শিক্ষার্থীদের তল্লাশি শুরু করেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা তাঁদের পরিচয় জানতে চাইলে তাঁরা পরিচয়পত্র দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে তাঁরা ওয়াকিটকি ও হাতকড়া দেখান।
পরে ঘটনাস্থলে অন্য শিক্ষার্থীরা উপস্থিত হলে উভয় পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তি হয়। তিন ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তাঁদের ছিনতাইকারী মনে করেন শিক্ষার্থীরা। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাসে করে তাঁদের ক্যাম্পাসে নিয়ে আসা হয়। ক্যাম্পাসে নামানোর পর তাঁদের মারধর করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরে ওই তিনজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস তাঁদের পুলিশ সদস্য ও সোর্স হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত করেন।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ও পুলিশ কর্মকর্তারা উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন। দীর্ঘ আলোচনার পর সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শিক্ষার্থী সিফাত হোসেন সিয়াম বলেন, ‘আমি আর আমার বন্ধু অর্প হাঁটছিলাম। অর্প একটু সামনে ছিল। হঠাৎ একজন এসে অর্পের বুকে হাত দিয়ে বলেন, “আমরা পুলিশ, আপনাদের তল্লাশি করব।” বলার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি অর্পের পকেটে হাত দেন। পরে তাঁরা আমাদের পরিচয় ও কোথায় থাকি, তা জানতে চান।’
সিয়াম বলেন, ‘আমরা নিজেদের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পরিচয় দিয়ে পরিচয়পত্র দেখানোর প্রস্তাব দিই। তখন কালো টি-শার্ট পরা আরেকজন পেছন থেকে আমার কলার টেনে ধরে বলেন, তাঁরাও পুলিশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাঁদের পরিচয়পত্র দেখাতে বললে তাঁরা তা না দেখিয়ে বারবার হাতকড়া দেখাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে একজন স্থানীয় ব্যক্তি এসে বলেন, পুলিশ হলেও এভাবে আচরণ করা উচিত নয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাস এলে তাঁদের ক্যাম্পাসে নিয়ে আসি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এখানে উভয় পক্ষেরই কিছু ভুল ছিল। পুলিশ সদস্যরাও নিজেদের পরিচয় দিতে চাননি। তাঁদের কাছে পরিচয়পত্র ছিল না। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদেরও ভুল ছিল। তাঁরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা প্রক্টরিয়াল বডিকে বিষয়টি জানাতে পারতেন। তা না করে জোরপূর্বক তাঁদের ক্যাম্পাসে নিয়ে আসা উচিত হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আমরা একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছেছি। দুই পক্ষই তা মেনে নিয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন আর না ঘটে, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।’
প্রক্টর জানান, উভয় পক্ষের সম্মতিতে লিখিতভাবে সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. লুৎফর রহমান বলেন, এ ঘটনায় পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিষয়ে প্রক্টর ইতিমধ্যে তাঁর বক্তব্য দিয়েছেন।
Leave a comment