বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে চীনের তৈরি ২০টি আধুনিক জে-১০সিই যুদ্ধবিমান। সরকার থেকে সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থায় এসব যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়ায় নীতিগত ও আর্থিক অনুমোদন পাওয়া গেছে। এ প্রকল্পের অর্থ পরিশোধে প্রায় ২৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দেওয়ার অনুমোদনও দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৭ সালের মধ্যে যুদ্ধবিমানগুলো বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারে।
যুদ্ধবিমান কিনতে ব্যয় ২১৩ কোটি ডলার
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল অ্যারো-টেকনোলজি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএটিআইসি) থেকে যুদ্ধবিমানগুলো কেনা হচ্ছে। এ জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২১৩ কোটি ১৬ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে যুদ্ধবিমান কেনার মূল ব্যয় প্রায় ১৯৬ কোটি ডলার। বাকি ১৭ কোটি ডলার ব্যয় হবে সুদ বাবদ।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, প্রথম কিস্তিতে মোট মূল্যের ২০ শতাংশ বা ৩৯ কোটি ১৯ লাখ ডলার অগ্রিম পরিশোধ করতে হবে। এরপর দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড পাওয়া যাবে। এ সময় শেষে বাকি অর্থ ছয়টি অসমান বার্ষিক কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের শর্ত
সূত্র জানায়, যুদ্ধবিমান কেনার অর্থায়নে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির অনুমোদন চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, মোট মূল্যের বাকি ৮০ শতাংশ অর্থ ছয়টি অসমান বার্ষিক কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে। এ ব্যবস্থাকে মূলত বাকিতে কেনাকাটা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে অপরিশোধিত অর্থ সরকারের সরাসরি দায়।
সারসংক্ষেপে বলা হয়, এ ধরনের দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে সাধারণত সরকারের গ্যারান্টির প্রয়োজন হয় না। তবে বিষয়টি স্পর্শকাতর এবং বিক্রেতা বিশেষভাবে অনুরোধ করায় বিবেচনার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি না করার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার বিষয়ে কোনো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনায় যাওয়ার আগে অর্থ বিভাগের সঙ্গে অর্থায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধবিমানের সঙ্গে থাকবে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র
ক্রয়চুক্তির আওতায় শুধু যুদ্ধবিমান সরবরাহ করবে না চীন। এর সঙ্গে থাকবে লজিস্টিকস সহায়তা, পাইলট ও ক্রুদের প্রশিক্ষণ, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নত যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহের ব্যবস্থা।
সূত্র জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার থেকে সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থায় চীন থেকে যুদ্ধবিমানগুলো কেনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়েছে বিমানবাহিনীর সদর দপ্তর। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছেন প্রধানমন্ত্রী।
জে-১০সিই নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার বক্তব্য
চীনের জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনার জন্য একটি কমিটি খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করেছে।
তিনি বলেন, রাফালকে ৪ দশমিক ৫ প্রজন্মের আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে জে-১০ যুদ্ধবিমানের কথিত সাফল্যের বিষয়টিও বাংলাদেশ বিবেচনায় নিয়েছে। এ কারণে যুদ্ধবিমানটি কেনার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জে-১০সিইতে যে প্রযুক্তি ও সক্ষমতা রয়েছে
জে-১০সিই এক ইঞ্জিন ও এক আসনবিশিষ্ট বহুমুখী যুদ্ধবিমান। এটি চীনের বিমানবাহিনীতে ব্যবহৃত জে-১০সি যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর জে-১০সি যুদ্ধবিমান নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়ে। পাকিস্তানের দাবি, ওই সংঘাতে তাদের ব্যবহৃত জে-১০সি যুদ্ধবিমান ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে ভূমিকা রেখেছিল। তবে এ দাবি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক রয়েছে।
জে-১০সিইতে রয়েছে অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (এইএসএ) রাডার। এর মাধ্যমে একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও অনুসরণ করা যায়। শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক জ্যামিং মোকাবিলার সক্ষমতাও রয়েছে যুদ্ধবিমানটিতে।
এ ছাড়া চীনের তৈরি দূরপাল্লার বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ (বিভিআর) এয়ার-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পিএল-১৫ বহন ও নিক্ষেপ করতে পারে এটি। উন্নত ডেটা লিংক এবং আকাশে থাকা আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নেটওয়ার্কভিত্তিক যুদ্ধ কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম জে-১০সিই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সমমানের ইউরোপীয় যুদ্ধবিমান রাফাল ও ইউরোফাইটার টাইফুনের তুলনায় জে-১০সিই কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় তুলনামূলক কম।
ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর অংশ এই ক্রয়
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা এগিয়ে নেয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও এ পরিকল্পনা অব্যাহত রেখেছে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়ন পরিকল্পনা ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর অংশ হিসেবে যুদ্ধবিমান কেনার এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিমানবাহিনীর বহরে থাকা পুরোনো এফ-৭ এবং মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি আধুনিক যুদ্ধবিমান যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নতুন যুদ্ধবিমান যুক্ত হলে দেশের আকাশসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারে বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বাড়বে।
Leave a comment