Home জাতীয় তিস্তায় বিলীন সুন্দরগঞ্জের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
জাতীয়

তিস্তায় বিলীন সুন্দরগঞ্জের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

Share
Share

তিস্তার ভাঙনে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের চরাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ‘ভোরের পাখি’র একাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিদ্যালয়ের পূর্ব প্রান্ত ও তিনটি জানালা নদীতে চলে গেছে। বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বিদ্যালয়ের আসবাব ও গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চরাঞ্চলের শিশুদের জন্য বিদ্যালয়টি ছিল একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকলেও এটি রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক বছর ধরে ওই এলাকায় নদীভাঙনের তীব্রতা বাড়ছিল। বিদ্যালয়টি রক্ষায় স্থানীয়রা বিভিন্ন সময় প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়ে আসছিলেন। উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও একাধিকবার এলাকা পরিদর্শন করেন। তবে তাঁদের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হলেও বিদ্যালয় রক্ষায় দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

গত ৮ আগস্ট পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। তাঁর পরিদর্শনের ১০ দিনের মধ্যেই বিদ্যালয়ের একাংশ নদীগর্ভে চলে যায়।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গতকালও স্কুলে ক্লাস হয়েছে। শিক্ষার্থীদের হাসি-আনন্দে ভরপুর ছিল বিদ্যালয়। আজ সেই বিদ্যালয়ের একাংশ নদীর বুকে। মন্ত্রী, এমপি, ডিসি, ইউএনও—সবাই এসেছেন, আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু স্কুল এলাকায় একটি জিও ব্যাগও ফেলা হয়নি।’

তিনি বলেন, সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হলে বিদ্যালয়ের এই পরিস্থিতি হয়তো এড়ানো যেত।

কাপাসিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, ‘টিও, এটিও, ইউএনও, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ডিসি—সবাই এলাকা পরিদর্শন করেছেন। চরবাসীর একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হামিদ বলেন, তাঁর দুই ছেলে এই বিদ্যালয়ে পড়ে। এখন তাঁরা কোথায় পড়বে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

আরেক অভিভাবক সুমি আক্তার বলেন, তাঁর মেয়েও এই বিদ্যালয়ে পড়ে। সকালে বিদ্যালয়ের একাংশ নদীতে বিলীন হওয়ার খবর পেয়ে তিনি সেখানে ছুটে আসেন। এখন সন্তানদের পড়াশোনা কীভাবে চলবে, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

ভাঙনের পর জিও ব্যাগ ফেলা শুরু

বিদ্যালয়ের একাংশ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর বুধবার সকালে পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙনের ঝুঁকি আগে থেকেই থাকলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড, গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই জিও ব্যাগ ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন কাজ চলছে।

আগে কেন জিও ব্যাগ ফেলা হয়নি—জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত বছর বিদ্যালয়ের আশপাশে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। তবে এবার স্কুল রক্ষায় জিও ব্যাগের কোনো বরাদ্দ ছিল না। গত সোমবার পর্যন্ত সেখানে ভাঙন ছিল না। ভাঙন না থাকলে জিও ব্যাগ ফেলার অনুমতি নেই। এখন যতটা প্রয়োজন হবে, ততটা জিও ব্যাগ ফেলা হবে।

ঘটনাস্থলে দেখা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের শ্রমিকেরা বিদ্যালয়ের অবশিষ্ট অংশ রক্ষায় জিও ব্যাগ ফেলছেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই উদ্যোগ আরও আগে নেওয়া প্রয়োজন ছিল।

অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ

উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুকুল চন্দ্র বর্মণ বলেন, নদীভাঙন শুরুর পর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, এলাকায় নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। বিদ্যালয়টি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত উপযুক্ত স্থানে বিদ্যালয়টি সরিয়ে নেওয়া হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিস্তার ভাঙনে সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় এরই মধ্যে বহু ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। গত তিন মাসে কাপাসিয়া ইউনিয়নে অন্তত ১৫টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

চরাঞ্চলের একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় শতাধিক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। দ্রুত বিকল্প স্থানে বিদ্যালয়টি স্থাপন করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

ইরানের মিনাবে হামলার শিকার স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আইআরজিসি কমান্ডারের প্রয়াত স্ত্রী

দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে সাম্প্রতিক হামলার শিকার হওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়টি দেশটির ইসলামি রিভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী ফাদাভির প্রয়াত...

পশ্চিমবঙ্গে উপনির্বাচন চলাকালে আটক বাবরি মসজিদের মূল উদ্যোক্তা হুমায়ুন কবীর

পশ্চিমবঙ্গের রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আম জনতা উন্নয়ন পার্টির বিধায়ক তথা রাজ্যটিতে বাবরি মসজিদ নির্মাণের মূল উদ্যোক্তা হুমায়ুন...

Related Articles

মুরাদনগরে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি সভা, নিরাপত্তায় সতর্ক প্রশাসন

  কুমিল্লার মুরাদনগরে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায়...

রাতে বাবাকে লাইভ লোকেশন, সকালে মিলল কিশোরীর মরদেহ

  কুমিল্লার লালমাইয়ে ফসলের মাঠ থেকে জান্নাতুল তাজমিন (১৫) নামের এক কিশোরীর...

অটোরিকশা নিয়ে কঠোর দুই সিটি প্রশাসক, ‘আইন না মানলে গ্রামে ফিরে যান’

রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর ও...

গোমস্তাপুরে দুস্থ ও অসহায়দের মধ্যে চেক ও আর্থিক অনুদান বিতরণ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে দুস্থ, অসহায়, অসুস্থ, প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে চেক...

;