মাথার ওপর নেই ছাদ, ঘরে নেই খাবার। একদিকে সন্তানদের ক্ষুধা, অন্যদিকে মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের সংকট। এই টানাপোড়েনে শেষ পর্যন্ত ঘরভাড়া পরিশোধ করতে নিজের মাথার চুল বিক্রি করেছেন রেহানা খাতুন। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশের খোলা জায়গায় দিন কাটছে তাঁর।
বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের রেহানা খাতুনের এই জীবনসংগ্রামের কথা স্থানীয়দের মধ্যে সহমর্মিতা তৈরি করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একসময় ভাড়া করা একটি ঝুপড়ি ঘরে দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতেন রেহানা। কয়েক মাস ভাড়া দিতে না পারায় দারিদ্র্যের কারণে তাঁকে সেই ঘরও ছেড়ে দিতে হয়। এরপর সন্তানদের নিয়ে কখনো অন্যের বাড়িতে, কখনো রেললাইনের পাশে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হয়েছে তাঁকে।
বর্তমানে রেলব্রিজের পাশে সরকারি জায়গায় স্থানীয়দের সহায়তায় বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো তৈরি করার চেষ্টা করছেন রেহানা। কয়েক মাস ধরে বাঁশের ফ্রেমটি দাঁড়িয়ে থাকলেও টিন ও বেড়া দেওয়ার সামর্থ্য তাঁর নেই। ফলে ঘরটি এখনো বসবাসের উপযোগী হয়নি।
শনিবার (৮ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা যায়, খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশের সন্তোষপুর গ্রামের প্রবেশমুখে বাঁশ দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। চারপাশ অরক্ষিত। সামান্য টিন ও বেড়ার ব্যবস্থা হলে সেখানে দুই সন্তানকে নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই হতে পারে রেহানার।
স্থানীয় নারী ফেরদৌসী বেগম বলেন, মাথা গোঁজার কোনো ঠিকানা না থাকায় রেহানা কিছুদিন পাশের একটি বাড়িতে ছিলেন। সেখানে ৫০০ টাকা ভাড়া দিতে না পারায় নিজের চুল বিক্রি করে সেই টাকা পরিশোধ করেন তিনি।
ফেরদৌসী বেগম বলেন, ‘একদিন হঠাৎ দেখি রেহানার মাথায় চুল নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোর চুল কী হয়েছে? তখন রেহানা কেঁদে বলে—“ও বু, কাউরে কইও না। ঘরের ভাড়া দিতে ৫০০ টাকায় চুল বেইচে দিছি।”’
রেহানার এই ঘটনা দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে। সন্তানদের মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করতে নিজের চুল বিক্রি করতে হয়েছে তাঁকে।
গ্রামের বাসিন্দা মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বাঁশের ফ্রেম যেহেতু তৈরি হয়েছে, এখন শুধু টিন ও বেড়ার ব্যবস্থা করলেই রেহানার একটি ঘর হয়ে যাবে। এলাকার বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের উচিত তাঁর পাশে দাঁড়ানো।’
বয়োজ্যেষ্ঠ স্থানীয় বাসিন্দা আবু তালেব শেখ বলেন, ‘রেহানার যে অবস্থা, তাতে তাঁর একটি ঘর খুব প্রয়োজন। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, দ্রুত যেন তাঁর জন্য একটি নিরাপদ ঘরের ব্যবস্থা করা হয়।’
দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন রেহানা। তাঁর চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়—মাথার ওপর একটি টিনের ছাউনি। যেখানে বৃষ্টি হলে সন্তানদের নিয়ে ভিজতে হবে না, শীতের রাতে কাঁপতে হবে না, অন্তত রাতটুকু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন তাঁরা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রেহানা খাতুন বলেন, ‘দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। একদিকে ঘর নেই, অন্যদিকে খিদের কষ্ট। নিরুপায় হয়ে চুল বিক্রি করেছি। এখন সরকার ও বিত্তবান মানুষের কাছে সাহায্য চাই।’
এলাকাবাসী জানান, রেহানা খাতুন তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাঁরা রেহানার পরিবারকে দ্রুত সরকারি আবাসন প্রকল্পের আওতায় এনে একটি নিরাপদ ঘরের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদেরও এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
Leave a comment