রাজধানীর উত্তরখানে একটি কারখানায় যাওয়ার একমাত্র সড়ক কেটে দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। কারখানাটির সামনে ময়লা ফেলা নিয়ে বিরোধের জেরে রোববার ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ও স্থানীয় সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের ওপর হামলার ঘটনার পর মধ্যরাতে সড়কটি কাটা হয়।
ডিএনসিসির দাবি, ওই স্থানে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় একটি নালা নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছে। তবে কারখানার কর্মীদের অভিযোগ, মালিকপক্ষকে ভোগান্তিতে ফেলতেই সড়ক কেটে দেওয়া হয়েছে।
বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকার নেপচুন অ্যাকসেসরিজ সলিউশন নামে একটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা। রোববারের ঘটনার পর থেকে কারখানাটি বন্ধ রয়েছে।
সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, কারখানার সামনের সড়ক খনন করে মাটি পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। কারখানার ভেতরে দায়িত্বশীল কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকজন কর্মী অভিযোগ করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত করতে সড়ক কেটে দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটির অঞ্চল-৮–এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আ ন ম বদরুদ্দোজা বলেন, ওই স্থানে পানি নিষ্কাশনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে একটি নালা নির্মাণের প্রয়োজন ছিল। কারখানা কর্তৃপক্ষের বাধার কারণে কাজটি করা যাচ্ছিল না। রোববারের ঘটনার পর কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় নালা নির্মাণ শুরু করা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে সড়কটি মেরামত করা হবে বলেও জানান তিনি।
বিরোধের সূত্রপাত
কারখানার সামনেই ২০২৩ সালে ডিএনসিসি একটি অস্থায়ী সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করে। কারখানার কর্মীদের অভিযোগ, এসটিএসে রাখা ময়লার দুর্গন্ধে কাজের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছিল এবং বিদেশি ক্রেতারাও আপত্তি তুলেছিলেন। পরে আদালতে গেলে এসটিএসে ময়লা রাখার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা পান কারখানা কর্তৃপক্ষ।
কর্মীদের দাবি, আদালতের নির্দেশের পর এসটিএসের ভেতরে না রেখে কারখানার সামনের সড়কেই ময়লা ফেলা শুরু করে সিটি করপোরেশন। এতে দুর্গন্ধের পাশাপাশি যাতায়াতও ব্যাহত হচ্ছিল।
তবে এসটিএসের কর্মী হাসমত আলী বলেন, আদালতের আদেশের কারণে ভেতরে ময়লা রাখা যাচ্ছে না। তাই সাময়িকভাবে সরকারি সড়কের অংশে ময়লা রাখা হচ্ছে। পরে রাতের বেলায় সেগুলো আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে নেওয়া হয়।
যেভাবে সংঘর্ষ
রোববার সকালে কারখানার সামনে ময়লা ফেলার দৃশ্য ধারণ করতে গেলে কারখানার এক ব্যবস্থাপকের সঙ্গে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে তা হাতাহাতি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে গড়ায়।
বিকেলে পরিস্থিতি দেখতে ঘটনাস্থলে যান ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ও ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। এ সময় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
কারখানার কর্মীদের দাবি, মালিককে হেনস্তা করা হচ্ছিল। তাঁকে রক্ষা করতে গিয়ে শ্রমিকেরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। অন্যদিকে ডিএনসিসির অভিযোগ, প্রশাসক ও সংসদ সদস্যের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে।
উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় ডিএনসিসির করা মামলায় এখন পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মধ্যরাতে সড়ক কাটা
প্রশাসক ও সংসদ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনার পর রাতেই কারখানার সামনের সড়ক খনন করা হয়। পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনের দুই শ্রমিক জানান, রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে সিটি করপোরেশনের একটি এক্সক্যাভেটর দিয়ে সড়কটি কেটে ফেলা হয়।
বিশেষজ্ঞের মত
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পরিকল্পিতভাবে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন স্থাপন না করায় এ ধরনের বিরোধ তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, রাজউকের মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সমন্বয় করে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন এবং প্রয়োজন হলে ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এসটিএস নির্মাণ করা উচিত, যাতে জনভোগান্তি ও স্থানীয় বিরোধ এড়ানো যায়।
Leave a comment