বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জয়মণি ঠোটা গ্রামের মৎস্যজীবী মিরাজ শেখ (৩০) নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় পৌনে চার মাস (১১২ দিন) ধরে। গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় স্থানীয় একটি চায়ের দোকানের সামনে থেকে সিভিল পোশাকের দুই ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছে তাঁর পরিবার ও একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী। স্বজনদের দাবি, কোস্টগার্ড সদস্যরা মিরাজকে তুলে নিয়ে গেছেন। তবে অভিযোগটি অস্বীকার করেছে কোস্টগার্ড।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে ঘটা ‘প্রথম গুমের ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
চায়ের দোকান থেকে তুলে নেওয়ার বিবরণ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিখোঁজ মিরাজ শেখ পেশায় সুন্দরবনের মৎস্যজীবী ও মৌসুমি মধু আহরণকারী। পাশাপাশি তিনি মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর পরিবারে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত বাবা, বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও সাত বছরের একটি সন্তান রয়েছে। পাঁচজনের সংসারে মিরাজই একমাত্র উপার্জনকারী।
প্রত্যক্ষদর্শী আল আমিন শেখ, সোহেল আলম ও স্থানীয় কয়েকজন গৃহবধূর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে জয়মণি গ্রামের শ্যালা নদীর তীরে আল আমিনের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলেন মিরাজ। এ সময় নদী পেরিয়ে আসা একটি ছোট নৌকা থেকে সিভিল পোশাকে দুজন লোক নেমে মিরাজের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তাঁকে চেপে ধরেন। মিরাজ ধস্তাধস্তি করলে তাকে মারধর করে নদীর জেটির দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরবর্তীতে মান্নান মাঝি নামের এক ব্যক্তির নৌকায় তুলে মিরাজকে শ্যালা নদীর মাঝখানে অবস্থিত বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের হাড়বাড়িয়া স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগে।
দোকানদার আল আমিন অভিযোগ করেন, ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ৪টার দিকে রবিন নামে এক ব্যক্তি কোস্টগার্ড পরিচয়ে এসে দোকানে রেখে যাওয়া মিরাজের লাল রঙের প্লাটিনা মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান।
পরিবারের বক্তব্য ও জিডি বিতর্ক
মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন জানান, খবর পেয়ে তিনি দুই মিনিটের মধ্যে জেটিতে পৌঁছান এবং স্বামীকে মারধর করে নৌকায় তুলে নিয়ে যেতে দেখেন। তিনি বলেন, “পরদিন আমি দিগরাজ বেইজে যাই। সেখানে প্রহারের পর জানানো হয় তাকে অপারেশনে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিকেলে গেলে তারা আবার সবকিছু অস্বীকার করে।”
মিরাজের বোন লিজা ইসলাম বলেন, “ভাইয়ের খোঁজে দিগরাজ বেজে গেলে কর্মকর্তারা বলেন যে সে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে কি না। পরে আবার সেই বক্তব্য প্রত্যাহার করেন। আমরা ভাই অপরাধী হলে আদালতের বিচার চাই, কিন্তু এভাবে গুম কেন করা হলো?”
ঘটনার ১৩ দিন পর ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। তবে পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ জিডিতে কোস্টগার্ডের নাম লিখতে দেয়নি এবং “বাসার নিচে থেকে হারিয়ে গেছে” বলে লিখতে বাধ্য করেছে।
এ বিষয়ে মোংলা সার্কেল অফিসের সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ রেফাতুল ইসলাম জানান, অভিযোগটি সঠিক নয়। স্বজনেরা মামলা না জিডি করবেন—তা ঠিক করতে সময় নিয়েছেন। তবে গুম বা অপহরণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে কেবল জিডি নয়, সরাসরি মামলা দায়েরের নিয়ম রয়েছে।
কোস্টগার্ডের অস্বীকার ও পাল্টা দাবি
বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মোংলা দিগরাজ বেইজ (পশ্চিম জোন)-এর মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার মাহবুব হোসেন প্রথম আলোকে জানান, “তার (মিরাজ) সম্পর্কে আমাদের কাছে কোনো তথ্যই নেই। জিডি হওয়ার পর আমরা বিষয়টি জানতে পেরেছি। অভিযোগের কোনো সত্যতা মেলেনি।”
তিনি আরও জানান, এপ্রিলের ২২ তারিখে সুন্দরবনের সামাদ বাহিনীর এক ডাকাতকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে মিরাজের নাম উঠে এসেছিল। পরদিন যৌথ অভিযানে তাকে খোঁজা হলেও পাওয়া যায়নি। ২৩ তারিখে হঠাৎ পরিবার নিখোঁজ জিডি করায় বিষয়টি রহস্যজনক ও সন্দেহজনক মনে হচ্ছে।
মানববন্ধন ও পন্টুনে হামলা
মিরাজের সন্ধানের দাবিতে গত ৯ জুন গ্রামবাসী মোংলায় একটি মানববন্ধন করে। সেখানে স্থানীয়দের সাথে কোস্টগার্ড সদস্যদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে ১১ জুন উত্তেজিত জনতা ও পরিবারের সদস্যরা কোস্টগার্ডের হাড়বাড়িয়া পন্টুন ও একটি স্পিডবোটে ভাঙচুর চালায়। এ সময় কোস্টগার্ড সদস্যরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
বর্তমানে পুলিশ বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে মোংলা থানা কর্তৃপক্ষ। তবে ১১২ দিন পার হলেও নিখোঁজ মিরাজ শেখের কোনো খোঁজ মেলেনি।
Leave a comment