কুমিল্লা জেলায় এইচআইভি/এইডস সংক্রমণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই (জানুয়ারি-মে) জেলায় এইডসে আক্রান্ত হয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আরও ৩৭ জনের শরীরে এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, নতুন আক্রান্তদের একটি বড় অংশই সমকামী বা পুরুষ-পুরুষ যৌনসম্পর্কে (MSM) জড়িত ব্যক্তি এবং পুরুষ যৌনকর্মী। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালের এইচআইভি/এইডস এইচটিসি-এআরটি সেন্টার সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সেন্টারের তথ্যমতে, চলতি বছরে এইডসে মৃতদের মধ্যে সর্বশেষ গত ২৫ মে ২১ বছর বয়সী এক বিবাহিত যুবক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর আগে ১৩ মে ৪৯ বছর বয়সী একজন এবং ৮ মে ৩৫ বছর বয়সী আরেকজন রোগীর মৃত্যু হয়। মৃতদের সকলেই কুমিল্লা জেলার স্থায়ী বাসিন্দা। এআরটি সেন্টারের কাউন্সিলর কাম অ্যাডমিন মো. আরিফ হাসান জানান, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুজন, মার্চে একজন, এপ্রিলে একজন এবং মে মাসে তিনজনের মৃত্যুসহ মোট মৃতের সংখ্যা সাতজনে দাঁড়িয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে কুমিল্লা জেলায় ৩৮৫ জন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৬৭২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩৭ জনের শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। নতুন আক্রান্তদের বিশদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮ জন পুরুষ-পুরুষ যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে এবং ৫ জন পুরুষ যৌনকর্মী হিসেবে সংক্রমিত হয়েছেন। এছাড়া ৩ জন বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে, ২ জন বিদেশে অবস্থানকালে এবং ১ জন নারী যৌনকর্মীর মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছেন। সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ২ জন এবং বাকি ৬ জনের সংক্রমণের উৎস এখনও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৪ জন একই সঙ্গে যক্ষ্মা (টিবি) রোগেও ভুগছেন।
কুমেক এআরটি সেন্টারের দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত মোট ৬ হাজার ৬৪৬টি এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৭৮ জন আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হন, যাদের মধ্যে ৪০ জন টিবিতেও আক্রান্ত ছিলেন। বর্তমানে এই সেন্টারের অধীনে মোট ৬১৫ জন রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন। গত ৭ বছরে এখানে মোট ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৩ জন চিকিৎসা কার্যক্রম থেকে ছিটকে পড়েছেন।
বছরের পর বছর কুমিল্লায় সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী। ২০১৯ সালে ১৫ জন শনাক্ত হলেও ২০২০ সালে ৮ জন, ২০২১ সালে ১৪ জন, ২০২২ সালে ২১ জন, ২০২৩ সালে ৪৮ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে রেকর্ড ৭২ জন এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হন। আর ২০২৬ সালের মাত্র পাঁচ মাসেই সেই সংখ্যা ৩৭-এ পৌঁছে যাওয়ায় বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা জানান, অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক, বিশেষ করে সমকামী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসচেতনতা ও সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের অনীহাই এই সংক্রমণের প্রধান কারণ। কুমেক হাসপাতালের এইচআইভি/এইডস সেন্টার জানিয়েছে, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এড়াতে আক্রান্তদের শতভাগ পরিচয় গোপন রেখে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা ও কাউন্সিলিং সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এই মরণব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা, নিরাপদ যৌন আচরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
Leave a comment