চট্টগ্রাম তথা দেশের অন্যতম মেগা প্রকল্প ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’ (কর্ণফুলী টানেল) চালুর পর থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। উদ্বোধনের পর থেকে গত ৯৪৫ দিনে (২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত) টানেলটি দিয়ে মোট ৩৬ লাখ ৬৪ হাজার ৭১৬টি যানবাহন চলাচল করেছে; যা দৈনিক গড়ে মাত্র ৩ হাজার ৮৭৮টি। অথচ সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ২০২৫ সাল নাগাদ প্রতিদিন গড়ে ১৯ হাজার ৬৬৯ থেকে ২৮ হাজার যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। এই হিসাবে পূর্বাভাসের চেয়ে বর্তমানে সাত গুণ কম গাড়ি চলায় চরম রাজস্ব সংকটে পড়েছে এই সুড়ঙ্গপথ।
টানেল ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত মে মাস পর্যন্ত চলাচলকারী মোট গাড়ি থেকে সরকারের সর্বমোট টোল বা রাজস্ব আয় হয়েছে ১০৬ কোটি ১০ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে টানেল থেকে রাজস্ব আয় হচ্ছে ১১ লাখ ২২ হাজার ৮৪৯ টাকা। বিপরীতে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টানেলের দৈনিক পরিচালনা ও সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ফলশ্রুতিতে, আয়ের চেয়ে প্রতিদিন ব্যয় বেশি হচ্ছে প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ, রাজস্ব আয়ের বিপরীতে ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেশি। এই ধারা অব্যাহত থাকলে প্রতি বছর প্রায় ৯৮ থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘাটতি থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনকি ঈদুল আজহার মতো বড় ছুটির দিনগুলোতেও এই রুটে উল্লেখযোগ্য হারে গাড়ির চাপ বাড়েনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টানেল ঘিরে পর্যটন নগরী কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামের দক্ষিণ অংশে যেসব বড় বড় শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক মেগা প্রকল্প গড়ে ওঠার কথা ছিল, তা এখনো দৃশ্যমান না হওয়ায় টানেলের উপযোগিতা বাড়ছে না। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র নদীর তলদেশের এই টানেলটি এখন বড় ধরনের অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই টানেলের নির্মাণ ব্যয় নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে। চীনের ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘টাইহু টানেল’-এর কিলোমিটারপ্রতি নির্মাণ ব্যয় যেখানে বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা এবং ভারতের মুম্বাই কোস্টাল রোড টানেলের প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ১ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা; সেখানে মাত্র ৩.৩২ কিলোমিটারের কর্ণফুলী টানেলে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকারও বেশি। ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ৯ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও, দফায় দফায় তা বৃদ্ধি পেয়ে শেষ পর্যন্ত ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এর মধ্যে বড় একটি অংশ—৬ হাজার ৭০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়েছে চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে। বিপুল এই বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ এবং চলমান লোকসানের কারণে টানেলের ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের অর্থনীতিবিদেরা।
Leave a comment