ভারতের মুম্বাইয়ের বাসিন্দা শুভাঙ্গী শেঠ দীর্ঘকাল ধরে ইতালির বিখ্যাত লেক কোমো’র আলপাইন পর্বতমালা আর নীল জলরাশির তীরে নিজের বিয়ের স্বপ্ন বুনে আসছিলেন—যেখানে একসময় জর্জ ক্লনি বা জন লেজেন্ডের মতো বিশ্বখ্যাত তারকারা বিয়ের শপথ নিয়েছিলেন। তবে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত ‘ডেস্টিনেশন ওয়েডিং’-এর ফ্যান্টাসি থেকে সরে এসেছেন তিনি। শুভাঙ্গী এখন চান নিজের দেশের ঐতিহ্য ও শিকড়ঘেরা কোনো পবিত্র স্থানে সনাতন রীতিতে জীবনসঙ্গীর হাত ধরতে।
শুভাঙ্গী শেঠের মতো ভারতের ধনী ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর তরুণ-তরুণীদের এই মানসিক পরিবর্তন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক। সম্প্রতি এক রাজনৈতিক র্যালিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি ভারতীয়দের বিদেশের মাটিতে জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের সংস্কৃতির সমালোচনা করে বলেছিলেন, “বিদেশে গিয়ে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং করার একটি নতুন চল শুরু হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, এর ফলে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যাচ্ছে।”
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখার জন্য মোদি সরকারের এই অবস্থান দীর্ঘদিনের হলেও, সাম্প্রতিক ‘ইরান যুদ্ধ’ এই জাতীয়তাবাদী প্রচারণাকে এক নতুন গতি ও বাধ্যবাধকতায় রূপ দিয়েছে। ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত হরমুজ প্রণালি কার্যত অবমুক্ত বা অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ভারত তাদের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে, যার সিংহভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে।
চলমান যুদ্ধের প্রভাবে ভারতে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং বিগত চার বছরের মধ্যে এই প্রথম মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দু’বার তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে দেশটির সরকার। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় মুদ্রার (রূপি) প্রায় ৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন ঘটেছে, যা বর্তমান এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মুদ্রার মধ্যে অন্যতম দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।
মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি ভারতের ১৪০ কোটি জনতাকে ব্যাপকভাবে ব্যয় কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বিদেশের পরিবর্তে দেশের অভ্যন্তরেই ছুটি কাটানো (ডমেস্টিক ট্যুরিজম), ট্রাফিক ও জ্বালানি খরচ বাঁচাতে ঘরে বসে কাজ করা (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) এবং বিদেশের মূল্যবান স্বর্ণের ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। উল্লেখ্য, ভারত বৈশ্বিকভাবে স্বর্ণের অন্যতম শীর্ষ ভোক্তা দেশ।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগ ব্যাংক ‘জেফ্রিস’ (Jefferies)-এর একটি সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে বিয়ের বাজার প্রায় ১৩ হাজার কোটি (১৩০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরই এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
ভারতে প্রতি বছর প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। বিগত বছরগুলোতে দেশটিতে বেশ কিছু বিশ্ব কাঁপানো বিলাসবহুল বিয়ের আয়োজন দেখা গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ২০২৪ সালে ভারতের শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানির রাজকীয় বিয়ে। মুম্বাই ও জামনগরের সেই আয়োজনে বিল গেটস, মার্ক জাকারবার্গ, কিম কার্দাশিয়ান এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিশ্বরাজনীতি ও কর্পোরেট দুনিয়ার শীর্ষ তারকারা উপস্থিত ছিলেন, যেখানে পারফর্ম করেছিলেন আন্তর্জাতিক পপ তারকা রিহানা। এর আগে জোধপুরের উমেদ ভবন প্রাসাদে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ও মার্কিন গায়ক নিক জোনসের জমকালো বিয়েও বৈশ্বিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল।
বিলাসবহুল বিবাহ পরিকল্পনাকারী (ওয়েডিং প্ল্যানার) বিক্রম শর্মা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে (CNN) জানান, ইরান যুদ্ধ ও রূপির অবমূল্যায়নের কারণে অনেক অভিজাত গ্রাহক এখন বিদেশের ব্যয়বহুল ভেন্যু বাদ দিয়ে দেশের ভেতরেই জাঁকজমকপূর্ণ রাজকীয় আবহে বিয়ের পরিকল্পনা করছেন। রাজস্থানের উদয়পুর, জয়পুর বা গোয়ার মতো অভ্যন্তরীণ ডেস্টিনেশনগুলোতে বুকিংয়ের হার পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মোদি সরকারের ‘ভারতে বিবাহ’ (Wed in India) নীতি একদিকে যেমন রূপির পতন ঠেকাতে অবদান রাখছে, অন্যদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিকে এক অভূতপূর্ব চাঙ্গাভাব এনে দিচ্ছে।
Leave a comment