বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালীতে টোল বা ফি আদায়ের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তবে রূপদান করল ইরান। পারস্য উপসাগরের এই কৌশলগত জলপথ ব্যবহারকারী আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো থেকে সংগৃহীত টোলের প্রথম দফার অর্থ ইতিমধ্যেই ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে (CBI) জমা হয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ইরানি পার্লামেন্টের দ্বিতীয় ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবাই এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপের তথ্য শেয়ার করে জানান যে, আন্তর্জাতিক এই জলপথ দিয়ে যাতায়াত করা ভেসেল বা জাহাজগুলো থেকে নির্ধারিত ফি সফলভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি একে ইরানের জাতীয় রাজস্ব বৃদ্ধিতে একটি ‘মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেন। মূলত নিজের জলসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নৌপথের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নির্বাহের যুক্তি দেখিয়ে এই টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তেহরান।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস এই সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে যায়। ফলে এই পথে টোল আরোপের বিষয়টি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সংস্থা এবং আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য বড় ধরণের আর্থিক ও নীতিগত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই পদক্ষেপ কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং একটি গভীর রাজনৈতিক কৌশল। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে থাকা তেহরান এই টোল আদায়ের মাধ্যমে আয়ের একটি বিকল্প এবং শক্তিশালী উৎস তৈরি করতে চাইছে। অন্যদিকে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নতুন করে কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই টোল আদায়ের প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল নীতি (UNCLOS) এবং মুক্ত নৌ-চলাচলের আইনি কাঠামোর সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচারালয়ে নতুন করে বিতর্ক ও আইনি লড়াই শুরু হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলো আগে থেকেই এই টোল আরোপের বিরোধী ছিল। তাদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবাধ চলাচলের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে। তবে ইরান দাবি করছে, তাদের জলসীমার মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা প্রদানে তারা যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে, এই টোল তারই অংশ।
Leave a comment