৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুরু হওয়া ‘মব-সন্ত্রাস’ বা গণপিটুনি ও মানসিক হেনস্তা এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের রূপ নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম তিন মাসেই নজিরবিহীন এই অরাজকতার শিকার হয়ে অন্তত ছয়জন শিক্ষক মৃত্যুবরণ করেছেন। শারীরিক আঘাতের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে দাঁড়িয়েছে মানসিক লাঞ্ছনা, যা অনেক শিক্ষককে ঠেলে দিচ্ছে স্ট্রোক বা হৃদরোগের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে।
‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর প্রদত্ত এক স্মারকলিপিতে উঠে এসেছে লোমহর্ষক সব তথ্য। তাদের দাবি অনুযায়ী, গত ৫ আগস্টের পর থেকে সারা দেশে প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩ হাজার ৫০০ শিক্ষক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। এই মব-সন্ত্রাসের শিকার হয়ে শারীরিক ও মানসিক চাপে ছয়জন শিক্ষক ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া পাঁচ শতাধিক শিক্ষক বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বা বাড়িতে অসুস্থ অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। অনেকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদের কারাবন্দী করা হয়েছে, যা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক অশনিসংকেত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার দোহারের জয়পাড়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল খালেক গত ২১ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কতিপয় শিক্ষকের যোগসাজশে বহিরাগত ‘মব’ বাহিনী তাকে স্কুল থেকে বিতাড়িত করে। দীর্ঘদিনের হীনম্মন্যতা, ভয় এবং দুশ্চিন্তার ফলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
অনুরূপ পরিস্থিতি দেখা গেছে ফেনীতে। সাউথ ইস্ট কলেজের অধ্যক্ষ বাবু পরমেশ চন্দ্র মব-সন্ত্রাসের চাপে পদচ্যুত হওয়ার পর থেকে গভীর হতাশায় ভুগছিলেন। গত ফেব্রুয়ারিতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। চট্টগ্রামের হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ এস এম আইয়ুবের মৃত্যুও ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। গত ২৪ সেপ্টেম্বর একদল শিক্ষার্থী ও বহিরাগত তাকে ক্যাম্পাসে ঘিরে ধরে জবরদস্তিমূলক পদত্যাগে বাধ্য করে। সেই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এছাড়া নওগাঁর হাঁপানিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নূরুল ইসলামও একই কায়দায় পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার পর অসুস্থ হয়ে মারা যান।
মব-সন্ত্রাসের ধরন এখন ডিজিটাল মাধ্যমেও ছড়িয়েছে। হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া শাহজাহানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিমের ঘটনাটি এর প্রমাণ। গত ৪ ফেব্রুয়ারি তাকে নিজ কক্ষে অবরুদ্ধ করে একদল যুবক মিথ্যা অপবাদ দিয়ে পদত্যাগের চাপ দেয়। এই পুরো দৃশ্যটি ‘ফয়সাল মিয়া’ নামক এক ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে প্রচার করছিল। চাপের মুখে শিক্ষক রেজাউল করিম চেয়ারেই জ্ঞান হারান। চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন, তীব্র ভয়ের কারণে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
কিশোরগঞ্জের আরজত আতরজান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুবকর সিদ্দিকের ক্ষেত্রেও পরিকল্পিত মব তৈরি করা হয়েছিল। কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা না থাকলেও প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও কিছু শিক্ষকের ইন্ধনে শিক্ষার্থীদের উসকে দেওয়া হয়। তার বাসায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হলে তিনি পরিবারসহ আত্মগোপনে যান এবং সেখানে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। যদিও পরবর্তী তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয় এবং তাকে পুনর্বহাল করা হয়, কিন্তু তার শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি অপূরণীয় রয়ে গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মব-সন্ত্রাসের পেছনে ছিল প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পদলোভী শিক্ষক, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী। শরীয়তপুরের কোদালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিল্লাল হোসেন মৃধার ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীরা স্বীকার করেছে যে, তাদের ন্যায্য আন্দোলনকে পুঁজি করে একটি পক্ষ প্রধান শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল।
ভুক্তভোগী শিক্ষকদের ভাষ্যমতে, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ নীরব ভূমিকা পালন করেছে। কোথাও কোথাও ‘সমঝোতা’র নামে অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হয়েছে, যা মব-সন্ত্রাসীদের আরও উৎসাহিত করেছে।
শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, শিক্ষাঙ্গনে এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও শিক্ষকদের প্রতি অসম্মান জাতির মেরুদণ্ডকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। জোরপূর্বক পদত্যাগ বা হেনস্তা কোনোভাবেই আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিলেও মাঠ পর্যায়ের চিত্র এখনো উদ্বেগজনক। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, যারা এই মব-সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত এবং যারা নেপথ্যে ইন্ধন দিয়েছেন, তাদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এক স্থায়ী মেধাশূন্যতা ও অস্থিতিশীলতার গহ্বরে পতিত হবে।
Leave a comment