দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি অব্যবহৃত রয়েছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার ২৭০ মেগাওয়াট হলেও সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে সর্বোচ্চ সময়ে প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে সক্ষমতার অর্ধেকও উৎপাদন করা যাচ্ছে না। সর্বোচ্চ উৎপাদন নেমে আসছে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের নিচে। ফলে ব্যাপক লোডশেডিং শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস, কয়লা ও তেল—এই তিন জ্বালানির সংকটে বর্তমানে ৬৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়েছে। ১৫ এপ্রিল দুপুর ৩টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৮৪৩ মেগাওয়াট। ১৬ এপ্রিল তা আরও বেড়ে দুপুর ১টায় ১ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াটে পৌঁছায়।
বর্তমানে দেশে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ৫০টি, যার মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৬ মেগাওয়াট। তবে বর্তমানে গড়ে উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। গ্যাস সংকটে ১১টি কেন্দ্র পুরোপুরি এবং ১২টি কেন্দ্র আংশিক বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে আমদানি ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে তাৎক্ষণিক বাজার থেকে গ্যাস কিনতেই অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে গ্যাস আমদানিও বন্ধ রয়েছে, ফলে সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
এদিকে দেশে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ৫৪টি, যার উৎপাদন সক্ষমতা ৫ হাজার ৬৩৭ মেগাওয়াট। বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে গড়ে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। সর্বোচ্চ সময়ে তা বাড়িয়ে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট করা হয়। জ্বালানি সংকটে এসব কেন্দ্রের মধ্যে ৭টি পুরোপুরি এবং ৩০টি আংশিক বন্ধ রয়েছে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থাও একই রকম। দুটি বড় কেন্দ্র আংশিক উৎপাদন করছে। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে মাত্র ১৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে। অন্যদিকে এসএস পাওয়ার কেন্দ্রের ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াটের বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ৩১০ মেগাওয়াট। ফলে এই দুই কেন্দ্রেই মোট ১ হাজার ৯০৪ মেগাওয়াট সক্ষমতা অব্যবহৃত রয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এবং ভারত থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুৎ মিলিয়ে বর্তমানে সময়ভেদে ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে চাহিদা প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। এপ্রিলের শেষ দিকে তাপমাত্রা বাড়লে চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সে সময় লোডশেডিং আরও বেড়ে রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
বর্তমানে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। হবিগঞ্জের বাসিন্দা শামীম আহমেদ জানান, তার এলাকায় টানা ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে, লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি ঝড়বৃষ্টিতে গাছ পড়ে বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়।
মেহেরপুরের বাসিন্দা অনুরাগ পিয়াল বলেন, “রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ যায়। দিনে-রাতে অর্ধেকের বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। কোনো দিন ৭ ঘণ্টা, আবার কোনো দিন ১০ ঘণ্টারও বেশি লোডশেডিং হয়।”
ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে সারা দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। দিন-রাতের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে পৌর এলাকার বাইরে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় লোডশেডিংয়ের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারাও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাদের মতে, কোথাও কোথাও লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩০ শতাংশ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
Leave a comment