Home অর্থনীতি বিদ্যুতের দাম ২০ শতাংশ বৃদ্ধি, ইউনিট প্রতি দাম বাড়বে ২ টাকা
অর্থনীতি

বিদ্যুতের দাম ২০ শতাংশ বৃদ্ধি, ইউনিট প্রতি দাম বাড়বে ২ টাকা

Share
Share

বাসাবাড়িতে ব্যবহারভেদে বিদ্যুতের দাম ৭ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০ দশমিক ১১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব তৈরি করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। একই সঙ্গে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তিনটি বিকল্প প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হয়েছে, যাতে ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি কমানো সম্ভব হয়। তবে লাইফলাইন বা প্রান্তিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে কোনো মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়নি।

বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বাড়তে থাকা চাপ মোকাবিলায় সরকার বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগ এ প্রস্তাব তৈরি করেছে। একই উদ্দেশ্যে গত ৯ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি পাইকারি ও খুচরা দামের পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে সুপারিশ দেবে।

যদিও আইন অনুযায়ী বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব বাংলাদেশ জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কমিশনের। প্রচলিত নিয়মে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো কমিশনের কাছে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। পরে যাচাই-বাছাই শেষে গণশুনানির মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য গড়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়। তখন প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য ছিল ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। একই সময়ে পাইকারি মূল্য ৫ দশমিক ০৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।

বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজের স্বাক্ষরিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুই বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম না বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করেছিল। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, ফার্নেস তেল ও ডিজেলের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং ভর্তুকির পরিমাণও দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

এই পরিস্থিতিতে সরকার একদিকে ব্যয় সাশ্রয়ের পদক্ষেপ গ্রহণ করে, অন্যদিকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। উচ্চমূল্যেও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি অব্যাহত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখতে কয়লার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে বেসলোড উৎপাদন বিঘ্নিত না হয়। তবে এসব উদ্যোগের ফলে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে।

বর্তমানে বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্য ৭ টাকা ৪ পয়সা, যা উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম। ফলে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা ভর্তুকির মাধ্যমে সমন্বয় করতে হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সম্ভাব্য ঘাটতি প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে এই চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে—

  • বর্তমান ৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে ৫০ পয়সা বাড়িয়ে ৭ টাকা ৫৪ পয়সা করলে প্রায় ৫ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা ভর্তুকি কমবে।
  • ১ টাকা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৪ পয়সা করলে প্রায় ১০ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা ভর্তুকি কমতে পারে।
  • ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ২৪ পয়সা করলে প্রায় ১২ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।

পাইকারি দামের পাশাপাশি খুচরা পর্যায়েও মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের সুরক্ষায় ০ থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য কোনো মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নেই। অন্যান্য আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ব্যবহারভেদে ধাপে ধাপে ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। শ্রীলঙ্কা আবাসিক খাতে ৭ দশমিক ২ শতাংশ, শিল্প খাতে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করেছে। একই সঙ্গে দেশটিতে পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিনের দামও প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সিঙ্গাপুরেও জ্বালানির মূল্য সরাসরি শুল্কে সমন্বিত হওয়ায় বিদ্যুতের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ২০২৫ সালে বিদ্যুৎ খাত পর্যালোচনার জন্য একটি কারিগরি মিশন পাঠায়। তারা বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে টানা দুই সপ্তাহ আলোচনা করে। তাদের সুপারিশে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে দক্ষতা বাড়ানো এবং ভর্তুকি কমাতে তিন বছর মেয়াদি একটি রূপরেখা প্রণয়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করে ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে কেবল তাৎক্ষণিক বাজার থেকে গ্যাস কিনতেই অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

এ ছাড়া জ্বালানি তেলে দৈনিক গড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। চলতি বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে পর্যাপ্ত নয়। আগামী জুন পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আরও প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল নির্বাচন স্থগিত, অনিশ্চয়তায় প্রার্থীরা

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল-এর নির্ধারিত নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অনিবার্য কারণ দেখিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যদিও স্থগিতের নির্দিষ্ট কারণ...

ইরান চুক্তির সম্ভাবনায় আশাবাদী হোয়াইট হাউসের বার্তা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে তারা আশাবাদী। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে এই ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ...

Related Articles

জ্বালানি সংকটে আংশিক বা পুরো বন্ধ ৬৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র

দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি অব্যবহৃত রয়েছে।...

বিহারি ক্যাম্পে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া ৭৭ কোটি টাকা

রংপুর ও নীলফামারীর সৈয়দপুরের বিহারি ক্যাম্পগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যবহার হলেও কোটি কোটি টাকার...

মাত্র দেড় মাসে ক্ষমতায় ব্যাংক ঋণের ভারে অর্থনীতি, ৪১ হাজার কোটি বৃদ্ধি

ক্ষমতার দেড় মাসের মধ্যেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করেছে...

ব্যাংক লেনদেনে কর আরোপের চিন্তা করছে সরকার: এনবিআর চেয়ারম্যান

চট্টগ্রামে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন...