Home আন্তর্জাতিক ইরান যুদ্ধ নিয়ে নীরব জেডি ভ্যান্স: ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে মতপার্থক্যের ইঙ্গিত?
আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধ নিয়ে নীরব জেডি ভ্যান্স: ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে মতপার্থক্যের ইঙ্গিত?

Share
ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে মতপার্থক্যের ইঙ্গিত
Share

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি যখন উত্তপ্ত, তখন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের তুলনামূলক নীরবতা নতুন করে রাজনৈতিক জল্পনা তৈরি করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তাঁর অবস্থান কী—তা নিয়ে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহল ও বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

গত বছরের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার কয়েক ঘণ্টা পরই ভ্যান্স টেলিভিশনের একটি জনপ্রিয় সানডে টকশোতে উপস্থিত হয়ে অভিযানের প্রশংসা করেছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি অভিযানটিকে “অবিশ্বাস্য” বলে একাধিকবার উল্লেখ করেন এবং সামরিক পদক্ষেপকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন।

এমনকি চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এক গোপন অভিযানের পরও ভ্যান্স দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানকে বৈধ ও প্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করেছিলেন।

কিন্তু ইরানে সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ পার হলেও এবার তাঁর কাছ থেকে তেমন কোনো প্রকাশ্য সমর্থন শোনা যায়নি। বরং বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি বিষয়টি নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ থেকে সচেতনভাবে বিরত থেকেছেন।

গত শুক্রবার নর্থ ক্যারোলাইনায় এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকরা জানতে চান, যুদ্ধ শুরুর সময় এবং সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কী পরামর্শ দিয়েছেন। ভ্যান্সের জবাব ছিল দীর্ঘ, তবে তিনি সরাসরি যুদ্ধ নিয়ে নিজের অবস্থান জানাননি।

তিনি বলেন, “আমি এখানে এসে সবার সামনে বলতে চাই না যে সেই গোপন কক্ষে আমরা কী আলোচনা করেছি।” এরপর কিছুটা রসিকতার সুরে যোগ করেন, “একটা কারণ হলো আমি জেলে যেতে চাই না, আরেকটা কারণ হলো প্রেসিডেন্টকে তাঁর উপদেষ্টাদের সঙ্গে গোপনে আলোচনা করার সুযোগ থাকা উচিত।”

এই মন্তব্যে স্পষ্ট হয় যে ভ্যান্স বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা এড়িয়ে যাচ্ছেন। ইরানে হামলার সময় ট্রাম্প ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে অবস্থিত ‘সিচুয়েশন রুম’ থেকে পুরো সামরিক অভিযানের তদারকি করেছিলেন। এই কক্ষ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সিদ্ধান্ত পর্যবেক্ষণ ও পরিচালনা করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভ্যান্সের এই সংযত অবস্থান তাঁর অতীতের বক্তব্যের সঙ্গে কিছুটা ভিন্ন। কারণ তিনি অতীতে বারবার বিদেশি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছিলেন।

২০২৩ সালে সিনেটর থাকাকালে লেখা এক মতামত নিবন্ধে ভ্যান্স যুক্তি দিয়েছিলেন, ট্রাম্পকে সফল প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিবেচনা করার অন্যতম কারণ হলো তিনি নতুন কোনো বড় যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে
জড়াননি। পরের বছর ২০২৪ সালেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের মূল জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয় এবং এতে বিপুল অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। এমনকি ২০২০ সালে ট্রাম্প প্রশাসন যখন এক ইরানি সামরিক কমান্ডারকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়, তখনও ভ্যান্স সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন।

গত বছর ফাঁস হওয়া কিছু ব্যক্তিগত বার্তাতেও দেখা যায়, ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে তিনি অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। এসব উদাহরণ দেখিয়ে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ভ্যান্স মূলত এক ধরনের “সীমিত হস্তক্ষেপবাদী” পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে।

তবে বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট—এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অংশ হিসেবে তাঁকে প্রেসিডেন্টের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে হয়। ট্রাম্পের রাজনৈতিক শৈলীতে সাধারণত ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কাছ থেকে দৃশ্যমান আনুগত্য প্রত্যাশা করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ভ্যান্সের প্রকাশ্য নীরবতা অনেকের কাছে কৌশলগত বলে মনে হচ্ছে।

সমালোচকেরা মনে করছেন, তিনি হয়তো ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক লক্ষ্য মাথায় রেখে নিজেকে কিছুটা দূরে রাখছেন। বিশেষ করে ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম প্রায়ই আলোচনায় আসে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধ নিয়ে অত্যধিক দৃঢ় অবস্থান নেওয়া ভবিষ্যতে তাঁর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে—বিশেষত যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়।

সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যকলাপেও এই সতর্কতা দেখা গেছে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দুই সপ্তাহে ভ্যান্স তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে মাত্র কয়েকটি পোস্ট করেছেন। এসব পোস্টের বেশিরভাগই ছিল নিহত মার্কিন সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো অথবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য শেয়ার করা।

একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের ভিডিওও তিনি পোস্ট করেছিলেন, যেখানে আলোচনার বিষয় ছিল ইরান। কিন্তু সেখানে তিনি মূলত প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত ও অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন—নিজস্ব মতামত প্রকাশ করেননি।

তাঁর বক্তব্যগুলোতে বারবার “প্রেসিডেন্ট মনে করেন”, “প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছেন”, “প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে বলেছেন” ধরনের বাক্য ব্যবহৃত হয়েছে। এতে বোঝা যায়, তিনি ব্যক্তিগত অবস্থানের বদলে প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক অবস্থানই তুলে ধরতে চাইছেন।

যদিও এটিই ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর দায়িত্বের অংশ, তবু পর্যবেক্ষকেরা মনে করিয়ে দেন—আগের বছর একই ধরনের পরিস্থিতিতে তিনি অনেক বেশি সরাসরি ও ব্যক্তিগত মন্তব্য করেছিলেন।

তবে সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স একটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেবে না বলে তিনি আশা করেন।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য সীমিত এবং সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে চলবে না।এর বাইরে তিনি ইরান ইস্যুতে প্রকাশ্যে খুব কম মন্তব্য করেছেন। একটি অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি শুধু নিহত সেনাসদস্যদের স্মরণ করেন এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন যে ভ্যান্সের দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর থেকে কিছুটা আলাদা হতে পারে।সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তাঁদের মধ্যে বড় কোনো মতবিরোধ নেই। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন যে ভ্যান্স হয়তো এই যুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারে কিছুটা কম উৎসাহী ছিলেন।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছেও বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে তিনি সরাসরি কোনো মতপার্থক্যের কথা অস্বীকার করেননি। বরং তিনি বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর এবং নীতিনির্ধারণী আলোচনায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

বিশ্লেষকদের মতে, হোয়াইট হাউসের ভেতরে মতবিনিময় ও ভিন্ন মত থাকা স্বাভাবিক বিষয়। তবে জনসমক্ষে সেই ভিন্নতা কতটা প্রকাশ পায়—তা অনেক সময় রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
বর্তমানে ভ্যান্স যেভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন, তাতে বোঝা যায় তিনি একই সঙ্গে দুইটি লক্ষ্য ধরে এগোচ্ছেন: প্রশাসনের আনুগত্য বজায় রাখা এবং নিজের রাজনৈতিক অবস্থানও ঝুঁকিতে না ফেলা।

কিন্তু যদি ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় বা নতুন সামরিক ফ্রন্ট খুলে যায়, তখন এই নীরব কৌশল ধরে রাখা তাঁর জন্য কতটা সম্ভব হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জেডি ভ্যান্স—তিনি কি কেবল সতর্ক কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করছেন, নাকি সত্যিই ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে সূক্ষ্ম মতপার্থক্যের প্রতিফলন ঘটছে? সময়ই এর উত্তর দেবে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬: প্রাইজমানি ঘোষণা, চ্যাম্পিয়ন ভারত পেল সর্বোচ্চ অর্থ

বহুল আলোচিত ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রাইজমানি বণ্টনের ঘোষণা দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মোট ২০টি দলের মধ্যে ১ কোটি ১২...

টেকনাফে র‍্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা, মোটরসাইকেলে আগুন, আহত ৭

কক্সবাজারের টেকনাফ সদর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ও একাধিক মামলার পলাতক আসামি ফরিদুল আলম (৩৮) কে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-১৫। গ্রেপ্তারের সময় উত্তেজিত জনতা...

Related Articles

আলি শামখানিকে অশ্রুসিক্ত বিদায় জানালেন ইরানিরা

ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির...

ইরাকে সামরিক বিমান দুর্ঘটনা: নিহত ৬ মার্কিন সেনার পরিচয় প্রকাশ

ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে সামরিক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত ছয় মার্কিন সেনার পরিচয় প্রকাশ করেছে...

সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সম্পূর্ণ সুস্থ , কোনো সমস্যা নেই: ইরান

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে...

ইরানের স্কুলে প্রাণঘাতী বোমা হামলা তদন্ত করবে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের একটি মেয়েদের স্কুলে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী বোমা হামলার ঘটনাটি আরও উচ্চপর্যায়ে...