Home জাতীয় অপরাধ ১২৩ বারের মতো পেছাল সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন
অপরাধআইন-বিচারআঞ্চলিকজাতীয়

১২৩ বারের মতো পেছাল সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন

Share
Share

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় আবারও পিছিয়েছে। এক যুগের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা এই আলোচিত মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে এ নিয়ে প্রায় ১২৩তমবারের মতো সময় আবেদন করা হলো। আদালত নতুন করে আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছেন।

সোমবার (৫ জানুয়ারি) মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন নির্ধারিত ছিল। তবে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নির্ধারিত দিনে প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়। পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজিজুল হক সময়ের আবেদন করলে ঢাকার মেট্টোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।

এ নিয়ে গত এক যুগে একের পর এক সময় বাড়ানোর ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে নিহতদের পরিবার, সহকর্মী সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে। দীর্ঘদিন ধরে বিচার প্রক্রিয়া থমকে থাকায় এ মামলাটি এখন বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত মামলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলাটির তদন্ত এখনো শেষ না হওয়ায় নির্দিষ্ট কোনো প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা সম্ভব হয়নি বলে তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে ঠিক কী কারণে তদন্ত এত দীর্ঘ হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।

আলোচিত এই হত্যা মামলায় মোট আটজন আসামি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রুনির বন্ধু তানভীর রহমান অন্যতম। অন্য আসামিরা হলেন—বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবির, রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু, কামরুল হাসান অরুণ, পলাশ রুদ্র পাল ও আবু সাঈদ। তদন্ত চলাকালে আসামিদের প্রত্যেককে একাধিকবার রিমান্ডে নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কেউ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন ভোরে তাঁদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই সময় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং দ্রুত বিচার ও প্রকৃত খুনিদের শনাক্তের দাবিতে সাংবাদিক সমাজ রাজপথে নেমে আসে।

হত্যাকাণ্ডের পরদিন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা দায়ের করেন। শুরুতে মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় ডিবি পুলিশের কাছে। পরে আদালতের নির্দেশে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল তদন্তের দায়িত্ব পায় র‍্যাব। তবে দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চালিয়েও রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ হয় সংস্থাটি।

দীর্ঘসূত্রতার প্রেক্ষাপটে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট র‍্যাবকে সরিয়ে দিয়ে এই মামলার তদন্তে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী বর্তমানে পিবিআই প্রধানের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি টাস্কফোর্স মামলাটি তদন্ত করছে। নতুন এই কাঠামোর মাধ্যমে দ্রুত অগ্রগতি হবে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এক যুগের বেশি সময় লাগা বিচার ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁদের মতে, বারবার সময় বাড়ানো হলে মামলার আলামত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে যায়। একই সঙ্গে এটি বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, তদন্ত সংস্থার কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন না এলে আদালতের পক্ষে কার্যকরভাবে বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তবে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, নতুন গঠিত টাস্কফোর্স দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে পারবে।

সাগর–রুনি হত্যা মামলা শুধু একটি পারিবারিক বা ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার সক্ষমতার প্রতীকী একটি পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত। বারবার সময় বাড়ানোর মধ্য দিয়ে সেই পরীক্ষায় রাষ্ট্র কতটা সফল হচ্ছে—সে প্রশ্ন এখন আরও জোরালোভাবে সামনে আসছে।
আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত তারিখে আদৌ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয় কি না, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে নিহতদের পরিবার, সাংবাদিক সমাজ এবং গোটা দেশ।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

পিলখানা হত্যাকাণ্ডে শহীদ ও খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাতে ছাত্রদলের ইফতার বিতরণ

সিলেটের জালালাবাদ রাগিব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রদলের উদ্যোগে নগরীর পাঠানঠুলা এলাকায় অর্ধশতাধিক ছিন্নমূল মানুষের মাঝে ইফতার বিতরণ করা হয়েছে। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ‘জাতীয়...

গোয়াইনঘাটে ইমাম রাখা নিয়ে দু’পক্ষের সংঘর্ষ-ভাঙচুর, আহত ১৫

মো. আজিজুর রহমান, গোয়াইনঘাট | সিলেটের গোয়াইনঘাট সদর ইউনিয়নের গহড়া গ্রামে বায়তুন নুর জামে মসজিদে তারাবির নামাজের ইমাম রাখাকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে...

Related Articles

বিশ্বনাথে মরহুম পংকি খানের কবর জিয়ারত করলেন নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াসের ছোট ভাই

  সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলা-এ বিশিষ্ট সালিশ ব্যক্তিত্ব মরহুম পংকি খান ও উপজেলা...

কলকাতায় মারা গেলেন আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি

  ভারতের কলকাতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখীপুর) আসনের সাবেক সংসদ...

আজ জামায়াতের ইফতারে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ইফতার মাহফিলে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক...

তারেকের ছেড়ে দেওয়া আসনে নির্বাচনে লড়বেন বিএনপির যে প্রার্থী

  বগুড়া-৬ (বগুড়া পৌরসভার ২১টি ওয়ার্ড ও সদর উপজেলা) আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির...