প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের সাফল্য কেবল সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়ানোর ওপর নির্ভর করে না; বরং সাধারণ মানুষের মুখের হাসিতেই বাজেটের প্রকৃত সফলতা নির্ধারিত হয় বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংসদে বাজেট নিয়ে আলোচনা শুনলে মনে হয় দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, কিন্তু বাস্তবে বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষ এর কোনো সুফল পায় না।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, “আমি নিজ এলাকায় বাজেটের আগে ‘নাগরিক ভাবনা’ নামে একটি মতবিনিময় সভা করেছি। সেখানকার সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকরা স্পষ্ট বলেছেন, সংসদে আপনাদের আলোচনা শুনলে মনে হয় সব সংকট দূর হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে বাজারে গেলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপর্যস্ত চিত্র দেখা যায়। জনগণের আসল সমস্যাগুলো আপনাদের সরকারি বক্তৃতায় থাকে না। প্রকৃতপক্ষে, বাজেটের নীতি নির্ধারণে সাধারণ মানুষ এমনকি সংসদ সদস্যদেরও তেমন কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ দেওয়া হয় না।”
এ সময় বাজেট উপস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির অভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বে বাজেট উপস্থাপনের ক্ষেত্রে ইনফোগ্রাফিক, ভিজ্যুয়াল ড্যাশবোর্ড ও সহজ টেবিল ব্যবহার করা হয়, যাতে সাধারণ মানুষ তা সহজে বুঝতে পারে। কিন্তু আমাদের সংসদীয় ব্যবস্থাপনায় এখনো সেই আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি।
দেশের স্বাস্থ্য খাতের তীব্র সমালোচনা করে এই সংসদ সদস্য বলেন, “একটি মানবিক হাসপাতাল—যেখানে ৭০০ বেডের মধ্যে ১৮০টি ফ্রি, প্রতিদিন ২৩টি নরমাল ডেলিভারি হয় এবং রোগী ও স্বজনদের বিনামূল্যে খাবার দেওয়া হয়—সেখানে শুধুমাত্র ৬টি শিশু মারা যাওয়ার অজুহাতে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হলো। অথচ দেশে যখন হামের প্রাদুর্ভাবে ৩০০ শিশুর প্রাণহানি ঘটল, তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে পদত্যাগের কথা ভাবলেন না কেন? ওই হাসপাতালটি বন্ধ করায় বর্তমানে ২৪৭ জন বিদেশি শিক্ষার্থী শিক্ষার অধিকার হারিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। তারা স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা সচিবের দেখাও পাচ্ছে না। এর ফলে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।”
সরকারের মেগা প্রজেক্টের আড়ালে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “আমরা সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাই। ১৫ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু শেষ পর্যন্ত ৪৫ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে শেষ হয়। এই মেগা প্রজেক্ট মানেই মেগা দুর্নীতি। দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের বড় বড় কথা বলা হলেও ভাঙ্গা পর্যন্ত রাস্তা দেখতে সিঙ্গাপুরের মতো মনে হয়, কিন্তু এরপর পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত রাস্তা একেবারে অজপাড়াগাঁয়ের মতো জরাজীর্ণ।”
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি উপস্থিত সংসদ সদস্যদের কুয়াকাটা ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, আপনারা সেখানে গিয়ে বাস্তব রাস্তার অবস্থা দেখে আসুন। মেগা প্রজেক্টের অর্থ তখনই সার্থক হবে, যখন তৃণমূলের সাধারণ মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারবে।
Leave a comment