সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতে ৬০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট (বিএলএস) অ্যাম্বুলেন্স নামানো হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি মহাসড়ক করিডরে পাইলট প্রকল্পের আওতায় এসব অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন করা হবে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সড়ক ভবনে নিজ কার্যালয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় কল সেন্টারের মাধ্যমে ঘটনাস্থলের সবচেয়ে কাছের অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হবে। অ্যাম্বুলেন্সে থাকা স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ আহত ব্যক্তিকে প্রাথমিক জরুরি চিকিৎসা দেবেন। এরপর দ্রুততম সময়ে তাঁকে নিকটস্থ উপযুক্ত হাসপাতালে নেওয়া হবে।
সওজের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, দুর্ঘটনার পরের প্রথম কয়েক মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে আহত ব্যক্তিকে যথাযথ সহায়তা দিতে পারলে প্রাণহানি কমানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্স পেতে দেরি হয় এবং হাসপাতালে নেওয়ার আগ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসাও পাওয়া যায় না। এ সমস্যা কমাতেই সমন্বিত জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যেসব মহাসড়কে শুরু হচ্ছে
প্রাথমিকভাবে চন্দ্রা-এলেঙ্গা হয়ে রংপুর পর্যন্ত মহাসড়ক, হাটিকুমরুল-নাটোর-রাজশাহীর কাটাখালী করিডর এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের নির্ধারিত অংশে এই সেবা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
নির্বাচিত করিডরগুলোতে কৌশলগতভাবে অ্যাম্বুলেন্সগুলো অবস্থান করবে। কোনো কোনো অংশে প্রায় ১০ কিলোমিটার পরপর অ্যাম্বুলেন্স রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে দুর্ঘটনার পর দূরের কোনো স্থান থেকে অ্যাম্বুলেন্স আসার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।
২৪ ঘণ্টা চালু থাকবে কল সেন্টার
অ্যাম্বুলেন্স সেবার জন্য একটি কেন্দ্রীয় কল সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে। এটি ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন চালু থাকবে। নির্ধারিত হটলাইন নম্বরে দুর্ঘটনার খবর দেওয়া হলে কল সেন্টারের কর্মীরা দুর্ঘটনাস্থল, ফোনকারীর অবস্থান ও আহত ব্যক্তির সংখ্যা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করবেন।
এরপর ঘটনাস্থলের সবচেয়ে কাছের অ্যাম্বুলেন্সকে সেখানে পাঠানো হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের কাছেও তথ্য পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অ্যাম্বুলেন্সে থাকবেন তিন স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ
প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সে তিনজন করে স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাঁরা আট ঘণ্টা করে পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করবেন। ফলে ২৪ ঘণ্টাই অ্যাম্বুলেন্সে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী থাকার কথা।
চালকেরাও শিফটভিত্তিক দায়িত্ব পালন করবেন। স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদদের সংশ্লিষ্ট পেশাগত প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকতে হবে। তাঁদের বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নিবন্ধনসহ নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করতে হবে।
এসব অ্যাম্বুলেন্সকে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। এগুলোতে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে জরুরি বেসিক লাইফ সাপোর্ট দেওয়ার জন্য অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকবে।
বিনা মূল্যে সেবা
সওজের প্রধান প্রকৌশলী জানান, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের জন্য অ্যাম্বুলেন্স সেবাটি বিনা মূল্যে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আহত ব্যক্তিকে প্রথমে নিকটস্থ উপযুক্ত হাসপাতালে নেওয়া হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শে ঢাকায় নেওয়ার প্রয়োজন হলে সে ব্যবস্থাও করা হবে বলে জানান তিনি।
প্রশিক্ষণ পাবেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা
অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানোর আগের সময় কাজে লাগাতে ‘বাইস্ট্যান্ডার কেয়ার’ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় মহাসড়কের আশপাশের স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার উপযোগী করে তোলা হবে।
সওজের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, দুর্ঘটনার পর স্থানীয় মানুষই সাধারণত সবার আগে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। কিন্তু প্রশিক্ষণের অভাবে তাঁরা অনেক সময় আহত ব্যক্তিকে কীভাবে সহায়তা করবেন, তা জানেন না। এমনকি ভুলভাবে আহত ব্যক্তিকে সরাতে গিয়ে তাঁর আরও ক্ষতি হতে পারে। তাই নির্ধারিত মহাসড়ক করিডরে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ মিটার পরপর দুজন করে স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁদের ফার্স্ট এইড বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। স্বেচ্ছাসেবকেরা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করবেন। তাঁদের ফার্স্ট এইড বক্স এবং আলাদা পোশাক বা পরিচিতিমূলক ড্রেস দেওয়া হবে।
পাইলট প্রকল্পের পর বিস্তারের পরিকল্পনা
মো. মনিরুজ্জামান বলেন, শুরুতেই বড় পরিসরে পুরো ব্যবস্থা চালু না করে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের সময় কোনো সমস্যা বা ঘাটতি দেখা দিলে তা চিহ্নিত করে সংশোধন করা হবে।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর প্রশিক্ষিত স্থানীয় মানুষ দ্রুত প্রাথমিক সহায়তা দিতে পারলে এবং একই সময়ে কেন্দ্রীয় কল সেন্টারের মাধ্যমে নিকটস্থ অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে পাঠানো গেলে উদ্ধারপ্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা সম্ভব হবে।
৬০টি অ্যাম্বুলেন্সের পাইলট প্রকল্প সফল হলে এর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেবাটি আরও বিস্তৃত করা হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক করিডরগুলোকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
Leave a comment