বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি বা ভারতের স্বার্থ রক্ষাকারী দালালদের চিহ্নিত করে তাদের হাত-পা ভেঙে পুলিশে সোপর্দ করার জন্য সাধারণ জনগণের প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ (বীর বিক্রম)। গতকাল শনিবার রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল জনসমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এই আক্রমণাত্মক ও কড়াপরামর্শ দেন।
দেশে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, চলমান তীব্র জনদুর্ভোগ লাঘব এবং পদ্মা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবিতে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে প্রধান বক্তার বক্তব্যে কর্নেল অলি বলেন, “বিদেশি বিশেষ করে ভারতের দালালদের কারণে আমরা গত ১৯ বছর দেশের মানুষ অনেক কষ্ট পেয়েছি, মার খেয়েছি। এখন সময় এসেছে এই দালালদের সমাজ থেকে চিহ্নিত করার। যেখানেই এদের পাওয়া যাবে, তাদের হাত-পা ভেঙে দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে।”
ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা শুভেন্দু অধিকারীর সাম্প্রতিক এক বিতর্কিত বিবৃতির কড়া সমালোচনা করে অলি আহমদ বলেন, “আমাদের দেখতে হবে এ দেশে শুভেন্দুর কোনো অনুসারী বা ফলোয়ার আছে কি না। এই লোকটা ভারতে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত বিষোদগার করছে এবং হুমকি দিচ্ছে যে যুদ্ধ ঘোষণা করবে, বাংলাদেশ দখল করে নেবে। আমি তাকে প্রশ্ন করতে চাই— এটা কি তোমার বাপের দেশ যে তুমি এসে দখল করে নিবা? আমরা বাংলাদেশিরা যদি এখন পাল্টা বলি আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও সেভেন সিস্টার্স সব দখল করে নেব, তখন তোমাদের কেমন লাগবে? আমরা তো তা বলছি না। আমরা শান্তিকামী রাষ্ট্র, আমরা বলি আমাদের শান্তিতে থাকতে দাও। তোমরা তোমাদের ঘরে শান্তিতে থাকো, তোমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে আমরা কোনো হস্তক্ষেপ করব না। কিন্তু তোমরা প্রতিনিয়ত আমাদের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বে আঘাত করে যাচ্ছ।”
ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে এলডিপির চেয়ারম্যান বলেন, “বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ব্যাপারে ভারত এখন নতুন চক্রান্তের পথ বেছে নিয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে কাদের সিদ্দিকীসহ আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত সীমান্ত এলাকা অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে আমাদের অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। তবে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ভদ্রলোক ছিলেন, যিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে সেই সমস্যার সমাধান করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান ভারতের ক্ষমতায় কোনো ভালো লোক বা ভদ্রলোক নেই। সেখানে মুসলমানদের নামাজ পড়তে দেওয়া হচ্ছে না, ঐতিহাসিক মসজিদ ভেঙে দেওয়া হচ্ছে এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিপরীতে আমাদের দেশে অন্য ধর্মের মানুষের ওপর কোনো অন্যায় ঘটে না, কারণ আমরা আমাদের শেষ নবীর উম্মত এবং আল্লাহর বিধান মেনে চলি।”
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকট ও অস্থিতিশীলতার চিত্র তুলে ধরে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশে বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এমনকি যে সমস্ত বড় বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এ দেশে কাজ করছিল, তারাও নিরাপত্তার অভাবে নিজেদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে। কর্মসংস্থান না থাকলে আমাদের তরুণ প্রজন্ম ও ছেলেমেয়েরা কোথায় যাবে? দেশে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, সাধারণ জনগণ দুঃসহ জীবনযাপন করছে। প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই কেবল হত্যাকাণ্ডের খবর দেখা যায়। মানুষের মনে যখন অশান্তি আর অভাব ভর করে, তখন তারা আর আইনের ডান-বাম বা বাছবিচার দেখে না।”
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানকে উদ্দেশ করে অলি আহমদ বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বুঝতে হবে যে তিনি দেশের এই বিশাল বেকার সমস্যা কীভাবে সমাধান করবেন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতকে কীভাবে সামাল দেবেন। তাঁর নিজের দলের এক শ্রেণির লোকজন যে দেশজুড়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজি করছে, যার সরাসরি প্রভাবে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, তাদের সুনির্দিষ্ট তালিকা করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা সরকারের জন্য কোনো সমস্যা তৈরি করছি না। বরং গত ৫০ বছরে আমাদের সংবিধানে এবং প্রশাসনে যে সমস্ত ভুলভ্রান্তি ও বৈষম্য তৈরি হয়েছে, সেগুলো সংস্কার করে দেশ ঠিক করার জন্য আপনাকে বিনীত অনুরোধ করছি।”
১১ দলীয় ঐক্য রাজশাহী বিভাগীয় শাখা আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ জনসমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এছাড়াও সমাবেশে জোটের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
Leave a comment