বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে দেওয়া ছয় মাসের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ চারটি প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর দাবি, জ্বালানি সংকট সমাধানের পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই বিরোধী দলের কাছে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে সেই পরিকল্পনা পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (১৫ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সংসদীয় কমিটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ইতিমধ্যে ১৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে সরকার সেগুলো আমলে নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
হাসনাত বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা প্রদানের জন্য ছয় মাসের আলটিমেটাম দিয়ে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন। আমরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম এবং সমাধান পরিকল্পনা প্রস্তাব করছি।’
তিনি বলেন, ‘চ্যালেঞ্জ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর জানা দরকার ছিল যে সমাধান ইতিমধ্যেই টেবিলে আছে।’ তাঁর দাবি, নাহিদ ইসলাম স্বল্পমেয়াদি ৩০ দিন, মধ্যমেয়াদি ৬ থেকে ১৮ মাস এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা মিলিয়ে মোট ১৫ দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন।
হাসনাতের ভাষ্য, ভর্তুকি নীতি, ফুয়েল প্ল্যান, কনটিনজেন্সি প্ল্যান ও ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান নিয়ে বিরোধীদলীয় সদস্যরা সমাধানধর্মী প্রস্তাব দিয়েছেন। নাগরিক সমাজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকেও বিভিন্ন মতামত এসেছে, যা জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ও বিভিন্ন সেমিনারে আলোচিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টা পরিষদের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী মিলিয়ে ৬২ জনের সভাসদ। এর একজনও নাগরিক মতামত বা বিরোধী দলের প্রস্তাবনা পড়ে দেখেননি।’
এনসিপির ৩০ দিনের জন্য পাঁচটি, মধ্যমেয়াদে ছয়টি এবং দীর্ঘমেয়াদে চারটি প্রস্তাব পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য বিরোধী দলের প্রস্তাবিত বিশেষ সংসদীয় অধিবেশন ডাকার বিষয়েও সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানান হাসনাত।
‘ফুয়েল প্ল্যান, কনটিনজেন্সি প্ল্যান নেই’
হাসনাতের অভিযোগ, গত ছয় মাসে প্রশাসনে ব্যাপক দলীয় পদায়নের কারণে প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা বা ‘ইনস্টিটিউশনাল মেমরি’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে ফুয়েল প্ল্যান, কনটিনজেন্সি প্ল্যান ও ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান নেই বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ভর্তুকি কাটা হয়েছে ঠিক সেখান থেকে, যেখান থেকে বিদ্যুৎ আসে, আর ক্যাপাসিটি চার্জ অক্ষত।’
মহেশখালীর এফএসআরইউতে আগুনের ঘটনায় রক্ষণাবেক্ষণে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, সে বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি বলেও দাবি করেন হাসনাত। তাঁর প্রশ্ন, ঘটনাটি নাশকতা নাকি অবহেলা—সরকার নিজেই তা জানে না।
মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি বাস্তবায়নের দাবি
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে ডলার ও বকেয়ার সংকটের কথা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও ভারী শিল্পকারখানাগুলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে বন্ধ হয়ে পড়েছিল বলে উল্লেখ করেন হাসনাত। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুমোদিত ‘মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫’ এখনো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না কেন, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
হাসনাতের দাবি, এই নীতির আওতায় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা সরাসরি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবেন। দুই পক্ষ বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিষয়টি অবহিত থাকবে এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে। এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হবে না বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘বাকি কাজ কেবল এসএলএ ফরম্যাট ও হুইলিং চার্জ চূড়ান্ত করা, যা কয়েক সপ্তাহের প্রশাসনিক কাজ।’
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে হাসনাত বলেন, ‘আপনি বলার আগেই আমরা সমাধান দিয়েছি। আপনারা সেটা পড়ার দরকার মনে করেননি কিংবা আপনার কাছে পৌঁছানো হয়নি। তথাপি, ছয় মাসের হিসাবটা আমরা মেনে নিলাম। কিন্তু ঘড়িটা বিরোধী দলের নয়, আপনার সরকারের।’
ছয় মাসের মধ্যে মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি বাস্তবায়ন করা না গেলে সেটি নীতিগত ব্যর্থতা নয়, সরকারের সক্ষমতার ব্যর্থতা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সবশেষে হাসনাত বলেন, ‘সমাধান আমাদের হাতে আছে। কিন্তু ক্ষমতা আপনার হাতে। ছয় মাস পর জনগণ জানতে চাইবে, দুটির মধ্যে কোনটির অভাবে দেশ অন্ধকারে ছিল।’
Leave a comment