২০০৭ সালের সেই উত্তপ্ত আগস্টের কথা আজও ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে অমলিন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির পথে হাঁটছিলেন, তখন তাঁর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল দিল্লির ৬২ জন বামপন্থী সংসদ সদস্য। সেই সময় ভারতের ক্ষমতার চাবিকাঠি ছিল কমিউনিস্টদের হাতে। দীর্ঘ দুই দশক পর, ২০২৬ সালের এই মে মাসে এসে ছবিটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ভারতের মানচিত্র থেকে মুছে গেল শেষ ‘লাল দুর্গ’।
কেরালা বিধানসভা নির্বাচনের সাম্প্রতিক ফলাফল ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। প্রাথমিক গণনায় দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যে ক্ষমতাসীন বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (LDF) বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। ১৪০টি আসনের মধ্যে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (UDF) ৯৮টি আসনে এগিয়ে থেকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে, যেখানে পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন বাম জোট মাত্র ৩৫টি আসনে সীমাবদ্ধ। ১৯৭৭ সালের পর এই প্রথম ভারতের কোনো রাজ্যেই আর বামপন্থী সরকার থাকছে না।
কেরালার সাথে বামপন্থার সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং আত্মিক ও ঐতিহাসিক। ১৯৫৭ সালে এই কেরালাই বিশ্বকে প্রথম উপহার দিয়েছিল গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার। ইএমএস নাম্বুদিরিপাদের নেতৃত্বে সেই সরকার ভূমি সংস্কার ও শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে ঝড় তুলেছিল। যদিও জওহরলাল নেহেরুর কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৫৯ সালে বিতর্কিতভাবে সেই সরকার ভেঙে দিয়েছিল, কিন্তু কেরালা ও বামপন্থা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে সমার্থক হয়ে উঠেছিল। গত ৪০ বছর ধরে কেরালায় প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ক্ষমতা বদলের ঐতিহ্য থাকলেও, ২০২১ সালে পিনারাই বিজয়ন সেই প্রথা ভেঙে টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে ইতিহাস গড়েছিলেন। কিন্তু এবারের রায় বলছে, সেই ইতিহাসের চাকা এখন উল্টো দিকে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের ফেলো রাহুল ভার্মার মতে, এটি ভারতের বাম রাজনীতির জন্য এক অস্তিত্ব সংকটের মুহূর্ত। তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার পর কেরালাই ছিল তাদের শেষ আশ্রয়। এই পরাজয় প্রমাণ করে যে, বামপন্থীরা তাদের চিরাচরিত ভোটব্যাংক ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, পতনের প্রধান কারণগুলো হলো: ১. আদর্শিক আপস ও ক্ষমতার ভাষা: স্বাধীন সমাজকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞ হরিশ বাসুদেবনের মতে, বামপন্থীরা তাদের মৌলিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। সরকার যখন সাধারণ মানুষের বদলে ‘ক্ষমতার ভাষায়’ কথা বলতে শুরু করে, তখন জনবিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। ২. জাত-পাত ও লিঙ্গ বৈষম্যের সমাধানে ব্যর্থতা: আধুনিক ভারতের রাজনীতিতে জাতিগত সমীকরণ এবং লিঙ্গ সমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বামপন্থীরা পুঁজিবাদের সমালোচনা করলেও এই সামাজিক জটিলতাগুলো সমাধানে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি। ৩. তরুণ নেতৃত্বের অভাব: ভারতের বিশাল তরুণ প্রজন্মের কাছে বিংশ শতাব্দীর কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক বুলি এখন আবেদনহীন। নেতৃত্বের বার্ধক্য এবং নতুন চিন্তার অভাব দলকে পিছিয়ে দিয়েছে।
বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের সরকার কিন্তু একেবারে ব্যর্থ ছিল না। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় কেরালা মডেল বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল। চরম দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প (EPEP)-এর মাধ্যমে কেরালাকে ভারতের প্রথম ‘চরম দারিদ্র্যমুক্ত’ রাজ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা প্রদান এবং পরিকাঠামো উন্নয়নেও এই সরকারের অবদান অনস্বীকার্য।
তা সত্ত্বেও, দুর্নীতির অভিযোগ এবং শাসনের অতি-কেন্দ্রীকরণ ভোটারদের ক্ষুব্ধ করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেরালায় ঐতিহ্যবাহী বামপন্থী ভোটাররাই এবার তাদের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ‘সংশোধনমূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে ব্যালটে জবাব দিয়েছেন।
একসময় পশ্চিমবঙ্গ (১৯৭৭-২০১১) এবং ত্রিপুরা (১৯৯৩-২০১৮) ছিল বামপন্থীদের অভেদ্য দুর্গ। ২০১১ সালে মমতা ব্যানার্জীর ঝড়ে বাংলায় বাম রাজত্বের অবসান ঘটে এবং ২০১৮ সালে উত্তর-পূর্বের ত্রিপুরায় বিজেপির উত্থান বামেদের প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত করে। জাতীয় সংসদের দিকে তাকালে এই পতন আরও স্পষ্ট হয়। ২০০৪ সালে যেখানে বামপন্থীদের ৬২টি আসন ছিল, বর্তমানে তা কমে এক অঙ্কের ঘরে (৮টি আসন) এসে ঠেকেছে। হিন্দি বলয় বা উত্তর ভারতে বামেদের অস্তিত্ব এখন কেবল শ্রমিক সংগঠনগুলোর কিছু পকেটে সীমাবদ্ধ।
প্রশ্ন উঠছে, ভারত কি তবে পাকাপাকিভাবে বামপন্থী রাজনীতিকে বিদায় জানাচ্ছে? জেএনইউ-এর সহকারী অধ্যাপক রাজর্ষি দাসগুপ্ত মনে করেন, সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তিনি বলেন, “বিশ্বজুড়ে বৈষম্য বাড়ছে এবং সম্পদ মানুষের হাতে কুক্ষিগত হচ্ছে। পুঁজিবাদ ও উদারীকরণের এই নেতিবাচক প্রভাবগুলো মোকাবিলায় একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী ‘সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক’ শক্তি হিসেবে বামপন্থীদের ফেরার সুযোগ আছে। তবে তার জন্য তাদের বিংশ শতাব্দীর পুরনো ছাঁচ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।”
ভারতে ধনী-দরিদ্রের ক্রমবর্ধমান ব্যবধান এবং কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি এমন এক বাস্তবতা, যা মোকাবিলায় বামপন্থী দর্শনের প্রয়োজনীয়তা অনেকেই অনুভব করেন। কিন্তু সংসদীয় রাজনীতিতে সেই দর্শনকে ভোটে রূপান্তর করার মতো সাংগঠনিক শক্তি ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমানে বাম দলগুলোর মধ্যে অনুপস্থিত।
কেরালার এই ফলাফল কেবল একটি সরকার পরিবর্তন নয়, বরং ভারতের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির এক গভীর সংকটের প্রতিফলন। লাল পতাকার এই পিছু হটা কি কেবল সাময়িক বিরতি, নাকি ভারতের মূলধারার রাজনীতি থেকে চিরতরে বিদায়—তার উত্তর দেবে মহাকাল। তবে আপাতত, পাঁচ দশক পর ভারত তার শেষ বামপন্থী সরকারটি হারিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের যুগে প্রবেশ করল।
Leave a comment