বগুড়ার গাবতলীতে নিজ শয়নকক্ষে এক গৃহবধূকে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করার খবর পাওয়া গেছে। নিহত গৃহবধূর নাম রীতা রানী রায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী প্রার্থনা মজুমদারের মা। বুধবার (২০ মে) গভীর রাতে এই হত্যাকাণ্ডের খবর যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে পৌঁছায়, তখন সেখানে এক বাকরুদ্ধ ও হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় ও হল সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাত ১১টার দিকে একটি ফোন কলের মাধ্যমে প্রার্থনা মজুমদার তার মায়ের নৃশংস মৃত্যুর খবর জানতে পারেন। মায়ের এমন আকস্মিক ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের কথা শুনে মাঝরাতেই হলের ভেতর কান্নায় ভেঙে পড়েন ওই শিক্ষার্থী। তার বুকফাটা আর্তনাদ আর আহাজারিতে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো হল। কান্না শুনে আশপাশের কক্ষের সহপাঠী ও অন্য ছাত্রীরাও সেখানে ছুটে আসেন এবং পুরো হলে শোকের ছায়া নেমে আসে।
ঘটনাটি জানতে পেরে গভীর রাতেই হলে ছুটে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক মো. ইসরাফিল প্রাং। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ওই ছাত্রীকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া এবং বাড়ি পাঠানোর উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ছাত্র এবং ওই শিক্ষার্থীর ভাই ক্যাম্পাসে পৌঁছালে প্রক্টর নিজ খরচে একটি গাড়ি ভাড়া করে গভীর রাতেই তাদের বগুড়ার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) মো. ইসরাফিল প্রাং গণমাধ্যমকে বলেন, “বিষয়টি জানার পরপরই আমরা ছাত্রীকে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি। গভীর রাতে কোনো যানবাহন না পাওয়ায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাড়ি ভাড়া করে তার ভাইয়ের সঙ্গে তাকে পাঠানো হয়েছে। এই কঠিন সময়ে ছাত্রীর পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সর্বাত্মক পাশে থাকবে।”
এদিকে, আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) বগুড়ার গাবতলী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিব হাসান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, খবর পেয়ে রাতেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শয়নকক্ষের মেঝে থেকে রীতা রানীর রক্তাক্ত ও নিথর দেহ উদ্ধার করে। মৃত্যুর সঠিক কারণ ও আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাত ১০টার দিকে রাতের খাবার শেষ করে রীতা রানী ও তার স্বামী বিধান চন্দ্র রায় আলাদা দুটি ঘরে ঘুমাতে যান। রাত সোয়া ১২টার দিকে হঠাৎ নিজের ঘরের দরজায় জোরে ধাক্কার শব্দে বিধান চন্দ্রের ঘুম ভাঙে। একই সময়ে তিনি পাশের ঘর থেকে স্ত্রীর অস্বাভাবিক গোঙানির শব্দ শুনতে পান। দ্রুত স্ত্রীর ঘরে গিয়ে মেঝেতে রীতা রানীর গলাকাটা দেহ পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসার আগেই দুর্বৃত্তরা ঘরের সদর দরজা দিয়ে পালিয়ে যায়।
গাবতলী মডেল থানার ওসি বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কোনো বিরোধ বা অভ্যন্তরীণ ঝামেলা থেকে এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে। তবে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচনসহ জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ এরই মধ্যে জোরালো তদন্ত শুরু করেছে। এ ঘটনায় থানায় একটি হত্যা মামলা রুজু করা হয়েছে।”
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মায়ের এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের। নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে তিনি লেখেন, “একটা জলজ্যান্ত মানুষকে ঘরে ঢুকে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে ফেললো। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আর কত খারাপ হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা আমাদের সরকার বাহাদুরের টনক নড়বে? মানুষ কবে একটু নিশ্চিন্তে নিজের ঘরে ঘুমাতে যেতে পারবে?”
Leave a comment