দেশের পাঁচ জেলায় এক রাতে দুই শিশুসহ ১০ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় এক পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। গত সোমবার রাতের কোনো এক সময় বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঘটনার পর প্রথমে ডাকাতির বিষয়টি সামনে আসে। পরে পুলিশ জানায়, প্রাথমিক তদন্তে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে দুটি বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
নিহতরা হলেন– বাহাদুরপুর গ্রামের নমির উদ্দিনের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩২), তাঁর স্ত্রী পপি সুলতানা (২৫), ছেলে পারভেজ (৯) ও ৩ বছরের কন্যা সাদিয়া আক্তার। পুলিশ জানায়, হাবিবুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। আর দুই সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে মাথায় ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করে। নিহত হাবিবুরের ঘরের দেয়ালে লেখা ছিল– ‘নমির বাচা গেলু (বেঁচে গেলি) দলিল চাই। এবার অর (তর) পালা।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাবিবুর গরু ব্যবসায়ী। সোমবার হাটে গরু বিক্রি করে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি। এ কারণে অনেকে ধারণা করছেন, টাকার জন্য দুর্বৃত্তরা লুটপাটের পর চারজনকে হত্যা করে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আরেকটি বিষয় সামনে আসছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, হাবিবুর তাঁর বাবার একমাত্র ছেলে। তাঁর বাবা পাঁচ মেয়েকে ১০ কাঠা করে জমি এবং হাবিবুরকে ভিটাসহ প্রায় ১০ বিঘা জমি রেজিস্ট্রি করে দেন। এই জমি বণ্টনকে কেন্দ্র করে ভাই-বোনদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এলাকাবাসীর ধারণা, এই বিরোধ থেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
নমির উদ্দিন বলেন, ‘জমিজমা নিয়ে অনেকদিন ধরেই অশান্তি চলছিল। আমার মেয়েরা ও তাদের স্বামীরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে। তারা বিভিন্ন সময়ে আমার ছেলেকে হত্যার হুমকিও দিয়েছে।’
নিহত পপির মা সাবিনা বেগম বলেন, ‘বিয়ের পর থেকেই ওরা (শ্বশুরবাড়ির লোকেরা) আমার মেয়েকে নির্যাতন করত। কয়েকদিন আগেও আমার মেয়েকে তার ননদ শিরিনা, তার স্বামী ভুটি আর তাদের পরিবারের লোকজন মিলে মারধর করেছে। আমার জামাইকে ১০ বিঘা জমি দেওয়াতেই তাদের সমস্যা। ডালিমা, শিরিনা, সুফি, সাহানারা আর কমেলা পাঁচ বোন। তারা এবং তাদের স্বামীরা মিলে আমার মেয়ে-জামাইকে মেরে ফেলেছে।’
নিয়ামতপুর থানার ওসি হাবিবুর রহমান বলেন, ডাকাতির উদ্দেশ্যে দুর্বৃত্তরা বাড়িতে প্রবেশ করেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পারিবারিক বিরোধসহ সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তারা হলেন–নিহত হাবিবুরের বাবা নমির উদ্দিন, বোন ডালিমা ও হালিমা এবং ভাগনে সবুজ রানা। এ হত্যাকাণ্ড কোনো ডাকাতি বা দস্যুতা–ওই রকম ঘটনা মনে হচ্ছে না। কারণ যে গৃহবধূ নিহত হয়েছেন, তাঁর কানে দুল রয়েছে। ঘটনাটি জমিজমা সংক্রান্ত পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে হতে পারে। মরদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের গহিন পাহাড় থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার সকালে উত্তর শীলখালী এলাকার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন–মুজিবুর রহমান, নুর বশর ও রবিউল আউয়াল। তিনজনই বাহারছড়া শীলখালী গ্রামের বাসিন্দা।
পুলিশ বলছে, মুজিবুর দীর্ঘদিন ধরে অপহরণ চক্রে জড়িত। তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি ডাকাতির মামলা রয়েছে। নূরের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা আছে। তবে রবিউলের বিরুদ্ধে মামলা না থাকলেও মানব পাচার ও অপহরণে সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ে লোকজনকে জিম্মি করে রাখার ঘটনা ঘটছে। মাঝে মধ্যে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শোনা গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, জিম্মিদের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে সংঘর্ষের জেরেই এ ঘটনা ঘটতে পারে। এমনও জানা গেছে, গত দুই দিন ধরে রোহিঙ্গাসহ বেশ কিছু লোকজনকে পাচারের উদ্দেশ্যে জিম্মি করে পাহাড়ের আস্তানায় রাখে দুর্বৃত্তরা। পরে গভীর রাতে জিম্মিদশায় থাকা লোকজন তাদের ওপর হামলা চালিয়ে পালিয়ে যায়। নিহতদের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও মাথায় জখমের চিহ্ন রয়েছে।
এদিকে নিহত রবিউলের বাবা রুহুল আমিন বলেন, ‘আমার ঘর থেকে ছেলেকে ডেকে নিয়ে যায় কে বা কারা। পরে সকালে পাহাড়ে মরদেহ পড়ে থাকার খবর পাই।’ টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, ধারণা করা হচ্ছে, অপহরণ ও মানব পাচারকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর বাইরেও সব দিক বিবেচনায় রেখে তদন্ত চলছে।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ছোট ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে বড় ভাই নিহত হয়েছেন। গত সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার কয়া ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া বাড়াদী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত রাশেদ শেখ (৩০) ওই এলাকার প্রয়াত রবিউল শেখের ছেলে। তিনি পেশায় ফেরিওয়ালা।
নিহতের স্ত্রী লাকী খাতুন বলেন, ‘জহুরুলের সঙ্গে কোনো শত্রুতা ছিল না। ও কাজ করে না, শুধু নেশা করত। গত ঈদে পাঁচ হাজার টাকা চাইছিল। কিন্তু দিছিলাম না। তখন হত্যার হুমকি দিছিল। সেই রাগ ও এতদিন পুষে রাখবে ভাবিনি।’
ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলায় বড় ভাইয়ের শাবলের আঘাতে আবু সুফিয়ান দিপু (৪০) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। গত সোমবার রাতে ভবানীপুর গ্রামের মুসলিম মিয়াজী বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর অভিযুক্ত আবুল বশরকে আটক করেছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রয়াত আবুল কাশেমের ছেলে দিপু সোমবার রাতে মা মনোয়ারা বেগমের কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা না দিয়ে মা টর্চলাইট দিয়ে মারতে চান। এ সময় দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। মনোয়ারা বেগমের চিৎকারে আবুল বশর শাবল নিয়ে ছুটে এসে দিপুকে আঘাত করেন। স্বজনরা প্রথমে তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। অবস্থা গুরুতর দেখে তাঁকে ফেনীতে নিতে বলেন চিকিৎসক। কিন্তু পথে তিনি মারা যান।
নরসিংদীতে মুজিবুর রহমান (৫৫) নামের একটি টেক্সটাইল মিলের কেয়ারটেকারকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। সোমবার রাত ৮টার দিকে নরসিংদী-মদনগঞ্জ সড়কের ৫ নম্বর ব্রিজ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। মুজিবুর নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদী থানার নুরালাপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের প্রয়াত তারা মিয়ার ছেলে। তিনি মাধবদী শহরের কালীবাড়ি এলাকার একটি টেক্সটাইল মিলের কেয়ারটেকার ছিলেন।
Leave a comment