২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল থেকে গণরুম সংস্কৃতি বিলুপ্তির ঘোষণা দেয় তৎকালীন প্রশাসন। পরে মেধা, সিনিয়র-জুনিয়র, দূরত্ব ও আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে আসন বরাদ্দের নীতিমালা চালু হয়। তবে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়-২৪ হলে নিয়মবহির্ভূতভাবে ২৪ শিক্ষার্থীকে তোলার অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে। এতে আবাসন নীতিমালা উপেক্ষিত হয়েছে বলে জানিয়েছে হল প্রশাসন। ঘটনাটি ঘিরে আবারও গণরুম সংস্কৃতি ফিরে আসার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
হল প্রশাসন ও আবাসিক শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় আবাসিক হল বিজয়-২৪–এর ১০১ ও ১০৮ নম্বর কক্ষে ১২ জন করে মোট ২৪ শিক্ষার্থীকে রাখা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ১০৮ নম্বর কক্ষে শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মো. আবুল বাশারের অনুসারী হিসেবে পরিচিত কর্মী তুহিব মাহমুদের মাধ্যমে ১২ জন এবং ১০১ নম্বর কক্ষে যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাসিম বিল্লাহ রিফাত পাটোয়ারীর মাধ্যমে আরও ১২ জন শিক্ষার্থী ওঠেন।
সরেজমিনে ওই দুই কক্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা হল প্রশাসনের মাধ্যমে নয়, ‘বড় ভাইদের’ সহযোগিতায় হলে উঠেছেন। ১০৮ নম্বর কক্ষের শিক্ষার্থীরা তুহিব মাহমুদ এবং ১০১ নম্বর কক্ষের শিক্ষার্থীরা রিফাত পাটোয়ারীর মাধ্যমে হলে ওঠার কথা জানান। তাঁদের কয়েকজন হল প্রভোস্টের নামও জানেন না।
নতুন কয়েকজন শিক্ষার্থী দাবি করেন, হলের স্টাফ আমিরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলেই তাঁরা হলে উঠেছেন। তবে প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আমিরুল ইসলাম এ অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তুহিব মাহমুদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই অসহায় শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে তিনি হলে শিক্ষার্থী ওঠানোর দায়িত্বে ছিলেন কি না—এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ফোন কেটে দেন।
অন্যদিকে যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাসিম বিল্লাহ রিফাত পাটোয়ারী বলেন, ১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটের বিষয়টি প্রভোস্টকে জানানো হয়েছিল। ১৮ ব্যাচের কয়েকজনকে অন্য কক্ষে স্থানান্তরের পর নতুনদের জন্য জায়গা হয়। তিনি কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে হলে তোলেননি বলে দাবি করেন। তবে ১০১ নম্বর কক্ষের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, তাঁরা তাঁর মাধ্যমেই হলে উঠেছেন।
শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব আবুল বাশার বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে হলে তোলেননি। তাঁর দাবি, ১০৮ নম্বর কক্ষে যাঁরা উঠেছেন, তাঁরা প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই উঠেছেন। প্রশাসনের দেওয়া একটি তালিকা তাঁর কাছে রয়েছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, গণরুম বা গেস্টরুম সংস্কৃতি চালুর কোনো সুযোগ নেই এবং আবাসন বরাদ্দ প্রশাসনের নীতিমালা অনুযায়ী হওয়া উচিত।
বিজয়-২৪ হলের প্রভোস্ট মাহমুদুল হাসান খান বলেন, ১০১ ও ১০৮ নম্বর কক্ষে মোট ২৪ শিক্ষার্থী উঠেছেন। তাঁদের হলে তোলার আগে তাঁকে জানানো হয়নি; পরে বিষয়টি তাঁর সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। তিনি বলেন, তিনি কোনো তালিকা দেননি। তবে ১৮ ব্যাচের কিছু শিক্ষার্থীকে অন্য কক্ষে স্থানান্তরের মাধ্যমে নতুনদের জন্য জায়গা তৈরির বিষয়ে কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থীকে বলেছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরিফুল করিম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। হল প্রভোস্ট বা প্রক্টর কেউ তাঁকে এ বিষয়ে জানাননি।
শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান শুভ বলেন, বিষয়টি তিনি সদ্য জেনেছেন। কেউ হলে উঠলে তাকে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মেনেই উঠতে হবে। অভিযোগের বিষয়ে তিনি খোঁজ নেবেন।
এদিকে ঘটনাটিকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা। তাঁদের দাবি, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া রাজনৈতিক পরিচয়ে শিক্ষার্থী হলে ওঠানো হলে তা স্বচ্ছতা ও সমতার পরিপন্থী এবং গণরুম সংস্কৃতি ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি করবে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোজাম্মেল হোসাইন আবির বলেন, শিক্ষার্থীকে হলে তোলার একমাত্র কর্তৃত্ব হল প্রশাসনের। রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে আবাসন দেওয়া হলে তা বৈষম্য সৃষ্টি করবে এবং গণরুম সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা বাড়াবে।
জাতীয় ছাত্রশক্তির সংগঠক নাঈম ভূইয়া বলেন, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া শিক্ষার্থী হলে ওঠা প্রশাসনের ব্যর্থতার পরিচয়। তিনি আবাসন নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানান।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সংগঠক মারুফ শেখ বলেন, আবাসন সংকটকে কেন্দ্র করে আবারও হল নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি আবাসন সংকট নিরসনে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ চান।
ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আবছার উদ্দিন ইফতি বলেন, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া নির্দিষ্ট দলের মাধ্যমে শিক্ষার্থী হলে ওঠানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হবে এবং গণরুম সংস্কৃতি ফিরে আসার ঝুঁকি বাড়বে।
Leave a comment