নাজমুল হাসান, মাদারীপুর
ভোর ৪টা। চারদিকে তখনও রাতের অন্ধকার। কিন্তু মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার ‘থানার মোড়’ তখনই সরগরম। ছোট ছোট দলে জড়ো হচ্ছেন খেটে খাওয়া মানুষ। কারও হাতে কোদাল, কারও কাঁধে কাস্তে, কারও হাতে টুকরি। রাজৈর, আমগ্রাম, বাজিতপুর ও পাশের কোটালীপাড়া থেকে আসা এসব দিনমজুর প্রতিদিনের মতো হাজির হয়েছেন কাজের সন্ধানে।
দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে রাজৈরের এই মোড়ে বসছে এক অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকের হাট। প্রতিদিন ভোরে এখানে শ্রমিক ও কাজদাতার মিলন ঘটে। বিক্রি হয় ঘাম আর শ্রম, আর শুরু হয় জীবিকার নতুন লড়াই।
তবে প্রতিদিন সবার ভাগ্যে কাজ জোটে না। মজুরি নিয়ে সমঝোতা না হওয়া কিংবা কাজের সংকটের কারণে অনেককেই খালি হাতে ফিরতে হয়। তবু পরদিন আবার নতুন আশায় হাজির হন একই মোড়ে।
আমগ্রাম এলাকার ৫০ বছর বয়সী দিনমজুর উৎপল বিশ্বাস বলেন, “আজ মজুরি নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় কোনো কাজ পেলাম না। খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। কিন্তু আমাদের তো সংসার চালাতে প্রতিদিনই টাকা লাগে। কাজ না পেলে পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাতে হয়।”
এই শ্রমের হাট শুধু শ্রমিকদের জীবিকার অবলম্বন নয়, স্থানীয় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী এখান থেকেই শ্রমিক নিয়োগ করেন।
দুই বিঘা জমির পাট কাটার জন্য শ্রমিক নিতে আসা স্থানীয় কৃষক লোকমান হাওলাদার বলেন, “চারজন শ্রমিক নিতে এসেছি। ভোর ৬টা থেকে জোহরের আজান পর্যন্ত কাজ করবেন। বর্তমানে মজুরি কিছুটা বেশি হলেও তাঁরা আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন। তাঁদের পরিশ্রমে আমরা সন্তুষ্ট।”
এই হাটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে কোনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা নেই। শ্রমিক ও নিয়োগদাতা সরাসরি আলোচনা করে মজুরি নির্ধারণ করেন।
রাজৈর থানার মোড় বণিক সমিতির সভাপতি লিটন শেখ বলেন, “অন্তত ৫০ বছর ধরে এখানে নিয়মিত শ্রমিকের হাট বসছে। আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের পাশাপাশি কোটালীপাড়া থেকেও শ্রমিকেরা আসেন। কোনো দালাল নেই। মালিক ও শ্রমিক সরাসরি মজুরি ঠিক করেন। বণিক সমিতির পক্ষ থেকে শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করি।”
ভোর পেরিয়ে সকাল গড়ায়। কেউ কাজ নিয়ে গন্তব্যে রওনা দেন, আবার কেউ ফিরে যান খালি হাতে। কিন্তু হতাশা তাঁদের থামাতে পারে না। পরদিন ভোরে আবারও জীবিকার আশায় হাজির হন রাজৈরের ‘থানার মোড়ে’—অর্ধশতাব্দীর ঐতিহ্য বহন করে চলা সেই শ্রমের হাটে।
Leave a comment