Home আন্তর্জাতিক টিকাদানে অস্ট্রেলিয়ার জরায়ু ক্যানসার নির্মূলের পথে অগ্রযাত্রা
আন্তর্জাতিক

টিকাদানে অস্ট্রেলিয়ার জরায়ু ক্যানসার নির্মূলের পথে অগ্রযাত্রা

Share
Share

অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জরায়ু ক্যানসার পুরোপুরি নির্মূলের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশটির জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি এবং গবেষণাভিত্তিক নীতিমালার কারণে এই ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

অস্ট্রেলিয়ার টুউম্বা শহরের বাসিন্দা ক্রিসি ওয়াল্টার্সের মতো অনেক নারীর জীবন এই রোগের কঠিন বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। দীর্ঘদিন সন্তান না হওয়ায় চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি জরায়ু ক্যানসারে আক্রান্ত হন, যা পরবর্তীতে তার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসকেরা জানান, তার রোগ আর সম্পূর্ণ নিরাময়ের পর্যায়ে নেই। এমন বাস্তবতার মধ্যেই দেশটি ক্যানসার প্রতিরোধে বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটছে।

অস্ট্রেলিয়ায় ১২ ও ১৩ বছর বয়সী স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা এইচপিভি টিকা বাধ্যতামূলকভাবে দেওয়া হচ্ছে। এইচপিভি ভাইরাস সাধারণত উপসর্গ ছাড়াই শরীরে থেকে যেতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে জরায়ু ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্বে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ক্যানসারের তালিকায় এটি চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।

২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরা ‘গার্ডাসিল’ নামে একটি টিকা উদ্ভাবন করেন, যা এই ভাইরাস প্রতিরোধে কার্যকর। পরবর্তীতে এটি অনুমোদন পাওয়ার পর ২০০৭ সালে দেশটি প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে এই টিকাদান কর্মসূচি চালু করে। সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে জরায়ু ক্যানসারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার অর্ধেকের বেশি কমে গেছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো ২৫ বছরের নিচে কোনো নতুন জরায়ু ক্যানসার রোগী শনাক্ত হয়নি। বর্তমানে প্রতি এক লাখ নারীর মধ্যে নতুন রোগীর সংখ্যা ৬ দশমিক ৩ জনে নেমে এসেছে, যা ‘নির্মূল’ সংজ্ঞার কাছাকাছি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো জনসংখ্যায় প্রতি এক লাখে চারজনের কম নতুন রোগী থাকলে সেটিকে কার্যত নির্মূলের পর্যায় হিসেবে ধরা হয়। অস্ট্রেলিয়া ২০৩৫ সালের মধ্যেই এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যদিও কিছু গবেষক মনে করছেন সময়ের আগেই তা সম্ভব।

তবে অগ্রগতির মাঝেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদানের হার তুলনামূলক কম এবং তাদের মধ্যে জরায়ু ক্যানসারের ঝুঁকি দ্বিগুণের বেশি। গবেষকরা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় অসমতা এবং সচেতনতার ঘাটতি এই পার্থক্যের অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে কোভিড-পরবর্তী সময়ে কিছু এলাকায় টিকাদানে অনীহা ও স্কুলভিত্তিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই হার কমে গেলে অর্জিত সাফল্য হুমকির মুখে পড়তে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষকরা অস্ট্রেলিয়ার এই সাফল্যকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি মডেল হিসেবে দেখছেন। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে একই ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে কঠিন বলে মত দিয়েছেন তারা।

সব মিলিয়ে টিকা, গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বয়ে অস্ট্রেলিয়া এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একটি ক্যানসারকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ নির্মূল করার স্বপ্ন বাস্তবের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

দক্ষিণ লেবাননে ধর্মীয় স্কুলে হামলা যুদ্ধবিরতি প্রশ্নবিদ্ধ

লেবানন-এর দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় একটি ধর্মীয় সন্ন্যাসীদের পরিচালিত স্কুল ধ্বংসের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্র ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে বলা হয়েছে, সীমান্তবর্তী এলাকায়...

কারাবন্দী নেতাদের মুক্তির দাবিতে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের মিছিল

ছাত্রলীগ-এর নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা চট্টগ্রামের পটিয়া এলাকায় মিছিল করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের মনসা বাদামতল এলাকায় এই...

Related Articles

ড্রোন প্রযুক্তির নতুন কৌশলে ইসরায়েলি সেনাদের চাপে হিজবুল্লাহ

লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে ড্রোন প্রযুক্তিতে নতুন কৌশল ব্যবহার...

স্পিরিট এয়ারলাইন্সের পতনে ইরান যুদ্ধ-উদ্ভূত জ্বালানি সংকটে বৈশ্বিক বিমান খাতে ধাক্কা

যুক্তরাষ্ট্রের স্বল্পমূল্যের বিমান সংস্থা স্পিরিট এয়ারলাইন্স সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে।...

হরমুজ প্রণালি বন্ধে বৈশ্বিক সার সরবরাহ ব্যাহত, খাদ্য সংকটের আশঙ্কা

ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায়...