নওগাঁ প্রতিনিধি
উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা নওগাঁ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদে সমৃদ্ধ। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন স্থাপনা, প্রত্ননিদর্শন ও নানা লোককথা। এসব ঐতিহ্যের মধ্যে ধামইরহাট উপজেলার চক-চান্দিরা এলাকার পাশাপাশি থাকা প্রায় ৩৬৫টি পুকুর এবং সংলগ্ন ঘুকশির বিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
নওগাঁ জেলা শহর থেকে প্রায় ৪৯ কিলোমিটার দূরে ধামইরহাট উপজেলা। উপজেলা সদর থেকে আরও প্রায় ১৯ কিলোমিটার দূরে ইসবপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত চক-চান্দিরা গ্রাম। এলাকাজুড়ে প্রায় আট কিলোমিটার বিস্তৃত অঞ্চলে ছোট-বড় অসংখ্য পুকুর পাশাপাশি অবস্থান করছে। স্থানীয়ভাবে এসব পুকুরের সংখ্যা প্রায় ৩৬৫টি বলে প্রচলিত। পুকুরগুলোর পাশেই রয়েছে বিস্তীর্ণ ঘুকশির বিল।
বর্ষাকালে ঘুকশির বিল পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়। চারপাশের সবুজ প্রকৃতি আর বিলের পানির মেলবন্ধনে সৃষ্টি হয় মনোমুগ্ধকর নৈসর্গিক দৃশ্য। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য দেখতে বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকরাও এখানে ছুটে আসেন।
৩৬৫টি পুকুরকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে নানা জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। একটি লোককথায় বলা হয়, কোনো এক প্রাচীন রাজা রাজপরিবারের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক পুকুর খনন করেছিলেন। বছরের ৩৬৫ দিনের প্রতীক হিসেবে পুকুরের সংখ্যাও ৩৬৫ করা হয়েছিল—এমন ধারণা স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত।
আরেকটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, অষ্টম শতাব্দীর পাল বংশের রাজা চান্দিলাল পাল তাঁর অসুস্থ রানির চিকিৎসার জন্য এক সাধু-কবিরাজের পরামর্শে ৩৬৫টি পুকুর খনন করেন। কথিত আছে, রানিকে প্রতিদিন আলাদা পুকুরে গোসল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
তবে এসব কাহিনির পক্ষে নির্ভরযোগ্য লিখিত ইতিহাস বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এখনো সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে রাজা-রানিকে ঘিরে প্রচলিত গল্পগুলোকে মূলত স্থানীয় লোককথা হিসেবেই দেখা হয়।
চক-চান্দিরায় পাশাপাশি প্রায় ৩৬৫টি প্রাচীন পুকুরের অস্তিত্ব স্থানীয়ভাবে জরিপ ও গণনার মাধ্যমে প্রচলিত একটি তথ্য। এসব পুকুর সরকারি নথিতেও রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। তবে ঠিক কখন, কার উদ্যোগে এবং কী উদ্দেশ্যে এতগুলো পুকুর খনন করা হয়েছিল—সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
লোকমুখে প্রচলিত এসব গল্পের সত্যতা ও এলাকার বাস্তব চিত্র দেখতে সম্প্রতি ঘুকশির বিল ও ৩৬৫ পুকুর এলাকা পরিদর্শন করেন নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
তিনি জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করাও তাঁর এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। প্রত্যন্ত এলাকায় পুলিশ সুপারের আগমনকে ঘিরে স্থানীয় অনেক প্রবীণ মানুষও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় প্রায় ৭০-৭২ বছর বয়সী কয়েকজন প্রবীণের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশ সুপার। তাঁরা ৩৬৫টি পুকুর ও ঘুকশির বিলকে ঘিরে প্রচলিত রাজা-রানির নানা গল্প তুলে ধরেন। প্রবীণরা জানান, তাঁরা ছোটবেলা থেকেই এসব পুকুর দেখে আসছেন এবং বংশপরম্পরায় এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাহিনি শুনে এসেছেন। তবে কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা সম্পর্কে তাঁরাও নিশ্চিত নন।
ঘুকশির বিল ও আশপাশের পুকুরগুলো শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ নয়; স্থানীয় কৃষি, মাছ চাষ, জীবিকা ও জল ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও এসব জলাশয়ের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। পাশাপাশি জলাভূমি ও পুকুরগুলো স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিকল্পিতভাবে এই এলাকার উন্নয়ন ও সংরক্ষণ করা গেলে গড়ে উঠতে পারে একটি সম্ভাবনাময় ইকো-ট্যুরিজম সার্কিট। যেখানে থাকতে পারে বিলের নৌভ্রমণ, পাখি পর্যবেক্ষণ, ৩৬৫ পুকুরের লোকঐতিহ্য, গ্রামীণ জীবন, স্থানীয় খাবার ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ।
ঘুকশির বিল হতে পারে প্রকৃতির আকর্ষণ, আর ৩৬৫ পুকুর হতে পারে লোকঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন। প্রকৃতি, লোককথা, জলাভূমি ও স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রাকে সমন্বিতভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করা গেলে চক-চান্দিরা ও ঘুকশির বিল হয়ে উঠতে পারে নওগাঁর একটি ব্যতিক্রমী পর্যটনকেন্দ্র।
Leave a comment