Home স্বাস্থ্য গরিব মানুষের ওষুধ নেই
স্বাস্থ্য

গরিব মানুষের ওষুধ নেই

Share
Share

কেরানীগঞ্জের শিকারীটোলা গ্রামের বাসিন্দা আম্বিয়া খাতুন (৫৮) প্রায় ১৫ বছর ধরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। স্বামী মারা যাওয়ার পরে দুই মেয়ের সংসারে ঠাঁই হয়েছে তার। গত তিন বছর ধরে কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনসিডি কর্নার থেকে চিকিৎসা এবং বিনামূল্যে ওষুধ পান তিনি।

আম্বিয়া খাতুন বলেন, ‘আগে হাসপাতাল থেকে দুইটা ওষুধ এক মাসের জন্য দিত।

কিন্তু কিছুদিন হলো দুইটা ওষুধের মধ্যে একটা দেয়, আরেকটা ২০ দিনের বেশি দেয় না। মেয়েদের অভাবের সংসারে আমার ওষুধের খরচ বাড়তি বোঝা। ওরা কিনে না দিলে মানুষের কাছে হাত পাততে হয়।’শুধু আম্বিয়া খাতুন নয়; সারা দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ১০টি জেলা হাসপাতাল মিলিয়ে ৪৪৬টি এনসিডি কর্নারে নিবন্ধন করে সেবা নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোগী ওষুধ পাচ্ছেন না।

এসব রোগীর অধিকাংশই বয়োবৃদ্ধ এবং নিম্নআয়ের মানুষ। উপার্জন করার মতো শারীরিক সক্ষমতাও তাদের নেই। ২০২৪ সালের জুনে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী প্রশংসা কুড়ানো এই কর্মসূচি মুখথুবড়ে পড়ছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মডেল বাস্তবায়ন করা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
২০১৮ সালের অক্টোবরে সিলেটের চারটি উপজেলায় প্রথম এনসিডি কর্নার চালু করা হয়। এতে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্ত, চিকিৎসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ, ওষুধ বিতরণ ও রোগীদের নিবন্ধন করে নিয়মিত ফলোআপ করা হয়। হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ (এনএইচএফবি), জাইকা, আইসিডিডিআর,বি, ব্র্যাক হেলথসহ আটটি প্রতিষ্ঠান কর্নারগুলো স্থাপনে সরকারকে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে ৩২৭টি এনসিডি কর্নারে হার্ট ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে ‘সিম্পল অ্যাপ’ এর মাধ্যমে ৯ লাখের বেশি রোগী নিয়মিত সেবা নিচ্ছে। এর মধ্যে ৭ লাখ রোগী উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত এবং ২ লাখ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
সবগুলো এনসিডি কর্নার মিলিয়ে এই ১২ লাখ রোগীর তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (এমআইএস)-এ সংক্ষরণের কার্যক্রম চলছে। এই এনসিডি কর্নার স্থাপন এবং যন্ত্রপাতি ও ওষুধের খরচ চালানো হয় ওপির টাকায়। কিন্তু ওপি না থাকায় প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছে না রোগী। এই কর্মসূচি শুরুর সময় ২০১৮ সালে এসব রোগ নিয়ন্ত্রণের হার ছিল মাত্র ১৮ শতাংশ। কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় নিয়ন্ত্রণের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ শতাংশে। কিন্তু নিয়মিত ওষুধ সরবরাহে ঘাটতি হওয়ায় রোগ নিয়ন্ত্রণ হার কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সূত্রে জানা গেছে, এনসিডি কর্নারে মূলত ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের জন্য মেটফরমিন ও গ্লিক্লাজাইড, উচ্চ রক্তচাপের জন্য অ্যামলোডিপিন, লোজারটেন পটাশিয়াম, হাইড্রোক্লোরোথায়াজাইড ওষুধ দেওয়া হয়। এনসিডি কর্নারের গুরুত্ব তুলে ধরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি থেকে বাঁচানো গেছে। বিশেষ করে দরিদ্রদের। কর্নারে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বেশির ভাগই প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ। ওপি না থাকার কারণে এনসিডির কাজ থেমে গেলে তা হবে চরম ব্যর্থতা।’

কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুল মোকাদ্দেস বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা আগে দুই মাসের ওষুধও একসঙ্গে রোগীদের দিয়েছি। কিন্তু ওপি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। কয়েক মাস পরে ১শ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হলে এনসিডি কর্নারের জন্য কিছু ওষুধ পায়। এ ছাড়া সিভিল সার্জন অফিস থেকে কিছু ওষুধ পাওয়া গেছে, হাসপাতালের ফান্ড থেকেও কিছু কেনা হয়েছে। কিন্তু এখন রোগীদের আর এক মাসের ওষুধ দিতে পারছি না, সেখানে ১০ দিনের করে দিচ্ছি।’

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) হালিমুর রশীদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এনসিডি কর্নার অপারেশন প্ল্যানের আওতায় চলত কিন্তু সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফান্ডের সংকট দেখা দিয়েছে। এখন এই ওষুধ কেনার জন্য অন্য কোথাও থেকে অর্থ দেওয়ারও সুযোগ নেই। আগামী বাজেটের পরে হাসপাতালের ফান্ড বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তখন হাসপাতালগুলো তাদের প্রয়োজন মতো এসব ওষুধ কিনতে পারবে।’

ওষুধ সংকটের আভাস দিয়ে গত ১৬ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) হালিমুর রশীদ স্বাক্ষরিত একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট এসেনসিয়াল ড্রাগ কোম্পানির মাধ্যমে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় ৪৪৬টি এনসিডি কর্নারে ৯৯ কোটি ৯৯ লাখ ৮৩ হাজার ৩৩২ টাকার ওষুধ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই ওষুধ দিয়ে আগামী দুই মাস চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখা যাবে। নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়বে। সরকারের সর্বশেষ স্বাস্থ্য বুলেটিন বলছে, দেশে সংক্রামক রোগের প্রকোপ ধীরে ধীরে কমলেও উল্টো অসংক্রামক রোগের চিত্র। মোট মৃত্যুর ৭০ শতাংশই হচ্ছে অসংক্রামক রোগে। যার ৩৪ ভাগই ঘটে হৃদরোগে। এ হৃদরোগের বড় কারণ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস। চিকিৎসকরা বলছেন, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো স্বাস্থ্য সমস্যার রোগীদের নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ ও চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। এ দুটি রোগের কারণে হৃদরোগ, কিডনি, ক্যানসারসহ বিভিন্ন অসংক্রামক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

ছেলেকে মাদরাসায় রাখতে যাচ্ছিলেন বাবা,পথে গুলি করে হ/ত্যা

পাবনায় ছেলের সামনে আলী হোসেন (৫৩) নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। সোমবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে পাবনা পৌর এলাকার জামিয়া আশরাফিয়া...

দুই দশক পর কক্সবাজার যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামী ১৩ ও ১৪ জুন কক্সবাজার সফরে যাচ্ছেন। প্রায় দুই দশক পর তাঁর এ সফরকে ঘিরে জেলা...

Related Articles

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৭ জন নতুন করে

হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই...

আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যু: কর্তৃপক্ষের গাফিলতির প্রমাণ, আইনি ব্যবস্থার ঘোষণা

রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের...

২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১,৩৩৪

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে।...

ডিআর কঙ্গোয় ইবোলা প্রাদুর্ভাবে ১৩১ জনের মৃত্যু, উদ্বেগ বাড়ছে

ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে ভয়াবহ ইবোলা প্রাদুর্ভাবে অন্তত ১৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে...