জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নাতি ও দলটির কৃষক উইংয়ের প্রধান সমন্বয়কারী আজাদ খান ভাসানী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে এনসিপির জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দলটির ভেতরে যে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতায় এই পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে।
রোববার (২৮ ডিসেম্বর) রাতে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে আজাদ খান ভাসানী আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপি ছাড়ার ঘোষণা দেন। সেখানে তিনি দলটির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, আদর্শিক অবস্থান এবং সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়ে গভীর হতাশার কথা তুলে ধরেন।
পোস্টে আজাদ খান ভাসানী লেখেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের হাত ধরে গঠিত এনসিপিতে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে। তাঁর ভাষায়, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত লড়াইয়ের একটি ধারাবাহিক অধ্যায়, যেখানে দীর্ঘ ৫৩ বছরের বৈষম্য, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে গণমানুষের রাষ্ট্র বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
তিনি উল্লেখ করেন, মওলানা ভাসানীর দেখানো গণমানুষনির্ভর, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী রাজনীতির আদর্শ থেকেই তিনি প্রথমে জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং পরে এনসিপির সঙ্গে যুক্ত হন। সেই ধারাবাহিকতায় দলের কৃষক উইংয়ের প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্বও গ্রহণ করেছিলেন তিনি।
তবে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে আজাদ খান ভাসানীর অভিযোগ, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা, গণমানুষের প্রতি দরদ ও আত্মত্যাগের প্রয়োজন ছিল—এনসিপির ভেতরে তার স্পষ্ট ঘাটতি তিনি অনুভব করেছেন। পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও দলটি প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি লেখেন, এই উপলব্ধির কারণেই তিনি গত কিছুদিন ধরে দলীয় কার্যক্রমে সরাসরি সক্রিয় ছিলেন না, যদিও এনসিপির সাফল্য কামনা করেই গেছেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মহান মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এবং মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক আদর্শের প্রশ্নটি তাঁর কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আজাদ খান ভাসানীর ভাষায়, সেই আদর্শিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত না হতেই তিনি এনসিপির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, দলের সঙ্গে স্বল্প সময়ের এই পথচলায় কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী এবং তরুণ নেতৃত্বাধীন দলটির জন্য আন্তরিক শুভকামনা রইল।
ফেসবুক পোস্টের বাইরেও তিনি সাংবাদিকদের জানান, ভেবে-চিন্তে ও পর্যবেক্ষণের পর সম্পূর্ণ আদর্শিক অবস্থান থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি এনসিপির ভবিষ্যৎ পথচলার জন্য শুভকামনাও জানান।
উল্লেখ্য, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটে এনসিপির যুক্ত হওয়ার ঘোষণার পর থেকেই দলটির একাধিক জ্যেষ্ঠ ও দায়িত্বশীল নেতা পদত্যাগ করেছেন। এর আগে দলের যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা, যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীনসহ আরও কয়েকজন নেতার পদত্যাগের খবর প্রকাশ্যে আসে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানান।
আজাদ খান ভাসানীর পদত্যাগকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এনসিপির জন্য একটি প্রতীকী ধাক্কা হিসেবে দেখছেন। কারণ, মওলানা ভাসানীর উত্তরাধিকার হিসেবে তাঁর নামটি দেশের প্রগতিশীল ও কৃষক-শ্রমজীবী রাজনীতির সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত। ফলে আদর্শিক প্রশ্নে তাঁর সরে দাঁড়ানো এনসিপির ভেতরের বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করেছে বলে মনে করছেন তারা।
Leave a comment