যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট যেটিকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ বলেছেন, তার মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়াতে চাইছে ওয়াশিংটন। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা কঠোর করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তবে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করতে অন্য দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের বদলে ট্রাম্প প্রশাসনের একের পর এক ভুল পদক্ষেপ বিশ্বকে দ্রুত ‘আমেরিকাবিহীন’ একটি নতুন ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করেন নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ জোসেফ ই. স্টিগলিটজ।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে স্টিগলিটজ এ আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান।
স্টিগলিটজের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত মিত্ররা কেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ব্যয়বহুল ও ভুলভাবে পরিচালিত’ এই যুদ্ধে যুক্ত হতে অনাগ্রহী, তা সহজেই বোঝা যায়। যুদ্ধ শুরুর আগে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। এর ওপর ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হওয়ার পর এখন কোনো বিকল্প পরিকল্পনাও নেই।
তিনি লিখেছেন, যে প্রশাসন নিয়মিত তার বন্ধু ও অংশীদারদের অপমান করে, গ্রিনল্যান্ড ও কানাডার মতো ভূখণ্ড দখলের হুমকি দেয় এবং মিত্রদের ওপরও শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করে, তার পাশে দাঁড়াতে কেউ কেন এগিয়ে আসবে?
স্টিগলিটজ বলেন, অন্য দেশগুলোকে নিজের সঙ্গে নিতে মূলত দুটি পথ রয়েছে—বোঝানো ও ভয় দেখানো। কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে কোনোটিই কার্যকর হচ্ছে না। কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলারের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে ‘ডি-ডে’ আসলে ‘হতাশার দিন’।
ট্রাম্পের কথায় বিশ্বাস হারিয়েছে বিশ্ব
স্টিগলিটজের মতে, অন্যদের বোঝাতে হলে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রয়োজন। তাদের বিশ্বাস করতে হবে যে প্রশাসনের লক্ষ্য অর্জনযোগ্য এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের সক্ষমতাও তাদের রয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের জন্য পরিচিত। ফলে তিনি যা বলেন, তা বিশ্বাস করার মতো লোক কমে গেছে।
২০২৫ সালের জুনে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ‘সম্পূর্ণ ও পুরোপুরি’ ধ্বংস করা হয়েছে। এর আগে মার্চে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতাও ‘আক্ষরিক অর্থেই’ ধ্বংস করেছে। অথচ যে যুদ্ধ চার সপ্তাহ বা তার কিছু বেশি সময় চলার কথা ছিল, সেটি এখন সপ্তম মাসে গড়িয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন স্টিগলিটজ।
তিনি বলেন, ইরান থেকে কানাডা—সবাই বুঝতে পারছে, ট্রাম্প কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও তার স্থায়িত্ব টিস্যু পেপারের মতোই ভঙ্গুর হতে পারে।
স্টিগলিটজের ভাষ্য, ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে বেসেন্টের ওপরও একসময় আস্থা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বন্ড ও মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থ চেষ্টায় তিনিও সেই বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ দেওয়ার ক্ষমতা কমেছে
স্টিগলিটজের মতে, বোঝানোর পথ বন্ধ হয়ে গেলে ট্রাম্পের হাতে থাকে তাঁর পছন্দের পথ—ভয় দেখানো ও শক্তি প্রদর্শন। কিন্তু এখানেই বড় সমস্যা। ট্রাম্প ও বেসেন্ট হয়তো বুঝতে পারছেন না যে অতীতের মতো এখন আর যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশগুলোর ওপর ইচ্ছামতো চাপ সৃষ্টি করতে পারে না।
আধুনিক যুদ্ধের ধরন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত অবস্থানও ট্রাম্প বুঝতে পারছেন না বলে মনে করেন তিনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপি অনুযায়ী বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। স্টিগলিটজের হিসাবে, তখন এই অংশ ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ; ২০২৫ সালে তা ১৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ‘চোকপয়েন্ট’ বা সরবরাহব্যবস্থার সংকটস্থলগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কমেছে। আধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত সবচেয়ে উন্নত চিপের বড় অংশ উৎপাদিত হয় তাইওয়ানে। অন্যদিকে ম্যাগনেট ও বিরল খনিজের উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে চীন গুরুত্বপূর্ণ আধিপত্য ধরে রেখেছে।
ইরানের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আগের মতো সব তাস নেই বলে মনে করেন স্টিগলিটজ। ইরানের তেল বিক্রির আয় কমাতে ক্রেতাদের ওপর চাপ দিতে চাইলেও ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ চীনে যায়। পাশাপাশি বিরল খনিজের ক্ষেত্রেও চীনের হাতে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে।
‘আমেরিকাবিহীন’ ব্যবস্থার দিকে বিশ্ব
স্টিগলিটজের মতে, ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতির প্রতিক্রিয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতির এই পরিবর্তিত বাস্তবতাই প্রতিফলিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে নিজেদের ক্ষমতা দ্রুত কমে যাচ্ছে—এমন উপলব্ধি থেকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আর পিছু হটতে চাইছেন না।
বিশ্বের অন্য দেশগুলোও সম্ভবত একই শিক্ষা নিচ্ছে বলে মনে করেন স্টিগলিটজ। তাঁর মতে, কাউকেই এ ধরনের চাপ সহ্য করতে হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করা বা দেশটির ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকাও বাধ্যতামূলক নয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতি বিভিন্ন দেশের সামনে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বহুমুখী করার নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
বেসেন্ট ও ট্রাম্প যত দ্রুত বুঝবেন যে তাঁদের হাতে থাকা তাস আগের মতো শক্তিশালী নয়, ততই যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য ভালো হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্টিগলিটজ।
তিনি বলেন, চীন ও অন্যান্য দেশ ট্রাম্পের সর্বশেষ দাবিগুলো প্রতিহত করলে তারা ভেঙে পড়বে না। যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি করতে চায়, তা-ও তাদের ওপর সহজে চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না।
বেসেন্ট যে ‘অর্থনৈতিক বিশ্বযুদ্ধের’ ঘোষণা দিয়েছেন, সেটি শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার মতো অচলাবস্থায় গিয়ে ঠেকতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন স্টিগলিটজ। এতে আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে বড় মূল্য দিতে হতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিক ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও ‘সফট পাওয়ার’ আরও দুর্বল করবে।
একসময় যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের জন্য একটি আদর্শ। দেশটি গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সুযোগ ও এমন কিছু মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করত, যা বিশ্বের বহু দেশের কাছে আকর্ষণীয় ছিল।
কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রই কী করা উচিত নয়, তার উদাহরণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন স্টিগলিটজ। তাঁর মতে, চরম বৈষম্য, গণতান্ত্রিক অবক্ষয়, দুর্নীতি ও সামাজিক বিভাজনের একটি সতর্কতামূলক উদাহরণ হিসেবে বিশ্ব যুক্তরাষ্ট্রকে দেখছে।
স্টিগলিটজের মতে, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—দুই ক্ষেত্রেই সহযোগিতা এবং আইনের শাসনের গুরুত্ব নিয়ে বিশ্বের নতুন করে ভাবা উচিত। অন্তত আপাতত, আমেরিকান নেতৃত্ব থেকে দূরে সরে যাওয়া একটি বিশ্ব সবার জন্য আরও স্থিতিশীল, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে।
Leave a comment