স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। এর আগে কয়েক মাস ধরে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি-লুটপাট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সেনাবাহিনীর একাংশের মধ্যে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছিল।
১৯৭৫ সালের শুরুতে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ—বাকশাল গঠন করা হয়। একই সময়ে চারটি ছাড়া অন্য সব সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর সংকুচিত হওয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভও বাড়তে থাকে।
অন্যদিকে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পর খাদ্যসংকট, দুর্নীতি, চোরাচালান ও লুটপাট পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তোলে। সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে খাদ্যশস্য পাচার এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনাও তখনকার সংবাদপত্রে উঠে আসে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি
দুর্ভিক্ষের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও হত্যার ঘটনা বাড়তে থাকে। ট্রেন ও লঞ্চেও ডাকাতির ঘটনা ঘটছিল। ১৯৭৫ সালের আগস্টের শুরুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঈশ্বরদীগামী একটি ট্রেনে ডাকাতির ঘটনায় দুই যাত্রী নিহত ও অন্তত ২২ জন আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
একই সময়ে সর্বহারা পার্টিসহ বিভিন্ন চরমপন্থী সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে সরকার। এসব অভিযানে গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে চরমপন্থীদের নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছিল।
সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ
রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি সেনাবাহিনীর একাংশের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়। বিশেষ করে তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের একটি অংশ একদলীয় শাসনব্যবস্থা, রক্ষী বাহিনীর ভূমিকা এবং আওয়ামী লীগের কিছু নেতার সঙ্গে সেনাবাহিনীর দ্বন্দ্ব নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিল বলে বিভিন্ন স্মৃতিকথায় উল্লেখ রয়েছে।
দুর্নীতি ও চোরাচালান দমনে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানোর পর ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতার সঙ্গে সেনা কর্মকর্তাদের বিরোধ তৈরি হয়। পরে সেনাসদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও তরুণ কর্মকর্তাদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়ে দেয় বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।
অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা করেন। মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান ও মেজর খন্দকার আব্দুর রশিদসহ কয়েকজন কর্মকর্তা এতে যুক্ত ছিলেন।
পরিকল্পনাকারীরা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গেও যোগাযোগ করেন। তাদের মধ্যে খন্দকার মোশতাক আহমেদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার কথা বিভিন্ন স্মৃতিকথায় উল্লেখ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী শেখ মুজিবকে উৎখাত ও হত্যার পর মোশতাক রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেবেন—এমন পরিকল্পনাও করা হয়েছিল বলে এসব বর্ণনায় উঠে আসে।
১৫ আগস্টের আগের দিন, ১৪ আগস্ট, অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের শেখ মুজিবের বাসভবন ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করেন বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর রাতে নিয়মিত মহড়ার আড়ালে ট্যাংক, অস্ত্র ও সেনাসদস্যদের নিয়ে ঢাকার সেনানিবাসে প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ১৫ আগস্ট ভোরে অভ্যুত্থানকারী সেনারা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের বাসভবনে হামলা চালায়। শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ওই ঘটনায় নিহত হন।
সব মিলিয়ে, ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের আগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ছিল গভীর সংকটপূর্ণ। অর্থনৈতিক দুরবস্থা, দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি, একদলীয় শাসনব্যবস্থা এবং সেনাবাহিনীর একাংশের অসন্তোষ—এসব কারণ অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উঠে এসেছে।
Leave a comment