মোহাম্মদ ইউনুছ অভি, টেকনাফ
দিন-রাত অবিরত ভেসে আসছে বিকট গুলির শব্দ। সন্ধ্যা নামলেই পাহাড়ঘেঁষা জনপদে নেমে আসে থমথমে আতঙ্ক। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সশস্ত্র চক্রের একের পর এক অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা।
কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী টেকনাফে একের পর এক অপহরণ ও জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। পাহাড়ি জঙ্গলে গড়ে ওঠা নিয়ন্ত্রণহীন এই অপরাধচক্রের দৌরাত্ম্যে জনমনে ভয়াবহ আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। কয়েক বছরে ওই এলাকায় তিন শতাধিক লোক অপহরণের শিকার হয়েছে। এই নৈরাজ্যের শেষ কোথায়?
দিন-রাত থেমে নেই গুলির শব্দ। পাহাড়ঘেরা জনপদে এখন আর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নেই। সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্ক, শুরু হয় গোলাগুলির শব্দ। সেই আতঙ্কের মধ্যেই একের পর এক অপহরণের ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া-নোয়াখালী এলাকার বাসিন্দারা। প্রাণভয়ে ইতোমধ্যে পাহাড়ঘেঁষা দুই গ্রামের অর্ধশতাধিক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। আবার অনেকে রাত হলে বাড়িতে থাকছে না। এমনকি জনপ্রতিনিধিরাও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত বলে জানিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতি চলছে গত কয়েক মাস ধরে। এর আগে মাঝেমধ্যে এসব ঘটনা ঘটলেও এখন নিত্যদিন ঘটছে। এ অবস্থায় উখিয়া-টেকনাফসহ বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পোস্টার টানিয়ে অপহরণ বন্ধে প্রতিবাদ চলমান রয়েছে।
গত ১৭ জুলাই বিকালে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের উত্তর নয়াপাড়া এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশ থেকে শিশু মো.আরাফাতকে (১২) অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিয়ে যায় পাহাড়ের অস্ত্রধারীরা। পরদিন চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়।
গত ২৮ জুন দুপুরে একই ইউনিয়নের নোয়াখালী জুম্মাপাড়ায় পাহাড় থেকে নেমে আসে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তারা অস্ত্রের মুখে একটি বাড়িতে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে চিকিৎসক কামাল উদ্দিনকে (৬৫) অপহরণ করে পাহাড়ের দিকে নিয়ে যায়। এখনও তার কোনও সন্ধান মেলেনি। এর আগে একই এলাকার বাসিন্দা হোসেন আলীকে (৫০) অস্ত্রের মুখে অপহরণ করা হয়েছিল। পরে পরিবারের সদস্যরা মুক্তিপণ দেওয়ার পর তিনি ফিরে আসেন।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালী ও কচ্ছপিয়া পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। সম্প্রতি সময়ে অব্যাহত গোলাগুলি ও একের পর এক অপহরণের ঘটনায় সবার মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। আরও অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্যমতে, সন্ধ্যা নামলেই পাহাড় থেকে ভেসে আসে গুলির শব্দ। সেই শব্দেই ঘুম ভাঙে, আবার সেই শব্দের মধ্যেই রাত কাটাতে হয়। শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ পুরো জনপদের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় ভেঙে পড়েছে। আতঙ্কে অনেকেই সন্তানদের নিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছেন। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যেও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তারাও বিকল্প স্থানে আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পাহাড়ঘেঁষা এই জনপদ আরও বেশি জনশূন্য হয়ে পড়তে পারে এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুরো জনপদ জনশূন্য হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা। বাহারছড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের প্রায় ৫০০ পরিবারের পুরো জনপদ আজ আতঙ্কের ঘরবাড়ি। ৩০ থেকে ৪০টি পরিবার ইতোমধ্যে তালা ঝুলিয়ে গ্রাম ছেড়েছে। অবস্থা এমন যে, জনপ্রতিনিধি হয়েও আমি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত এবং গ্রাম ছাড়ার কথা ভাবছি। দ্রুত যৌথ বাহিনীর সমন্বিত অভিযান না চালালে এই পাহাড়ি এলাকা পুরোপুরি মানুষশূন্য হয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন,সর্বশেষ পল্লী চিকিৎসক কামাল উদ্দিন এবং শিশু আরাফাতকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এখন আরও অনেক পরিবার এলাকা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভয় ও অনিশ্চয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমিও নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। প্রয়োজনে অন্যত্র আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবছি।
তিনি বলেন, দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিত অভিযান চালিয়ে অপহরণকারীদের গ্রেফতার না করলে এবং পাহাড়ঘেঁষা জনপদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে পুরো এলাকা জনশূন্য হয়ে যাবে। এখানের মানুষ এখন শুধু নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা চায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের তথ্য বলছে, টেকনাফের পাহাড়ঘেঁষা এই জনপদে অপহরণ, মুক্তিপণ এবং সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত তিন বছরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ৩২০ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু গত এক বছরেই ১৫টি ঘটনায় প্রায় ১৫৫ জনকে অপহরণ করা হয়, যাদের মধ্যে ৯৬ জনই রোহিঙ্গা নাগরিক। অধিকাংশ ভুক্তভোগী পরিবারের দেওয়া মোটা অঙ্কের মুক্তিপণের বিনিময়ে ফিরে এসেছেন।
অপহরণের পাশাপাশি বেড়েছে সহিংসতা। গত ৩ মে নোয়াখালীপাড়া ব্রিজ এলাকায় অপহরণের চেষ্টার সময় শহীদ উল্লাহ (১৯) নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। এর আগে এপ্রিল মাসে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে সুমাইয়া নামে এক তরুণী নিহত হন। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে একই এলাকায় বস্তাবন্দি এক অজ্ঞাত ব্যক্তির খণ্ডিত লাশ এবং পাহাড়ি এলাকা থেকে তিন জনের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। একের পর এক অপহরণ, হত্যা ও গুলির ঘটনায় এখানে দিন দিন আতঙ্ক বাড়ছে।
নোয়াখালী জুম্মাপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ শাকের জানান, ভিটেমাটিতে নিরাপত্তা না থাকায় স্ত্রী-সন্তানদের শহরের ভাড়া বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে তিনি দিনে শুধু ভিটে পাহারা দেন এবং রাতে অন্য জায়গায় গিয়ে ঘুমান।
এখানে মানুষের নিরাপত্তা বলতে কিছুই নেই। দিন-রাত অবিরাম গুলির শব্দ শোনা যায়। একের পর এক অপহরণের ঘটনার পরও আমরা কোনও কার্যকর সমাধান দেখতে পাচ্ছি না। তাই মানুষ প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে এলাকা ছাড়ছে।তিনি আরও বলেন, আমাদের পরিবারে পাঁচ জন সদস্য। কিন্তু এখন আমি ছাড়া বাড়িতে আর কেউ থাকে না।
পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে স্ত্রী-সন্তানদের টেকনাফ পৌরসভার পুরান পল্লানপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় রেখে এসেছি। আমি দিনে বাড়িতে থেকে ঘর পাহারা দিই, আর সন্ধ্যা হলে নিরাপত্তার কারণে অন্যত্র গিয়ে রাত কাটাই। নিজের বাড়িতে থেকেও আজ আমরা নিরাপদ নই। এটি শুধু আমার নই, পুরো এলাকাবাসীর চিত্র।
নোয়াখালীপাড়ার পান ব্যবসায়ী মো. সাব্বির বলেন, আমরা এখন চরম প্রাণের ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ঘরে পাঁচ হাজার টাকাও নিরাপদে রেখে নিশ্চিন্ত থাকতে পারি না। প্রতিটি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটছে। আমাদের জীবন কতটা অনিরাপদ হয়ে পড়েছে, সেটি একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে।
ভীতি কাটিয়ে জনপদে স্বস্তি ফেরাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী জানান, রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে পরিচালিত এই অপহরণ ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে খুব দ্রুত বিশেষ যৌথ অভিযান শুরু হবে এবং এলাকায় স্থায়ী পুলিশ চৌকি স্থাপনের প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে।
বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন বলেন,রাত-দিন গোলাগুলি ও অপহরণের ঘটনায় মানুষ চরম আতঙ্কে রয়েছে। অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। দ্রুত যৌথ বাহিনীর অভিযান জোরদার না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হবে।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: সাইফুল ইসলাম বলেন,অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান শুরু হবে। আমরা কোনও অপরাধীকে ছাড় দিচ্ছি না। ইতিমধ্যে বাহারছড়া এলাকায় পুলিশের মোবাইল টিম দেওয়া হয়েছে। দ্রুত বাহারছড়াকে নিরাপদ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, বাহারছড়ায় অপহরণ ও সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনে বড় পরিসরে যৌথ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। খুব শিগগির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Leave a comment