মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সামরিক সংঘাত এক রক্তক্ষয়ী ও অনিয়ন্ত্রিত রূপ ধারণ করেছে। গত মঙ্গলবারের পর বুধবার গভীর রাতে ফের কুয়েত এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে একযোগে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভিজাত শাখা ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)। আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালের দিকে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি (IRIB) আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আইআরজিসি-র পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বরাত দিয়ে আইআরআইবি-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি’ লঙ্ঘন করে বুধবার মধ্যরাতে দক্ষিণ ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার উপযুক্ত জবাব দিতেই এই পাল্টা হামলা পরিচালনা করা হয়েছে।
বিবৃতিতে ইরানের সামরিক বাহিনী জানায়, “মার্কিন চুক্তি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের পাল্টা ও প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপের প্রথম পর্যায় হিসেবে, আইআরজিসি-র নৌ এবং অ্যারোস্পেস বাহিনীর ক্ষিপ্রগতির যোদ্ধারা কুয়েতের আরিফান ও আল-সালেম ঘাঁটি এবং বাহরাইনের জাফাইর ও শেখ ইসা ঘাঁটিতে একটি সুনিপুণ যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অপারেশন পরিচালনা করেছে। ইরানজুড়ে কাপুরুষোচিত উপায়ে শত্রুপক্ষের হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই এই প্রতিশোধমূলক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।” আইআরজিসি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, “যদি শত্রুপক্ষ (আমেরিকা) ফের এই অঞ্চলে এমন আগ্রাসন বা উস্কানি দেয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে অবস্থিত তাদের বাকি ঘাঁটিগুলোতেও এর চেয়ে কঠোর ও বিধ্বংসী অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
মধ্যপ্রাচ্যের এই সাম্প্রতিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল গত ৫ জুলাই শনিবার, যখন ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তির শর্ত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে আকস্মিক হামলা চালায় আইআরজিসি। ওই হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে দক্ষিণ ইরান এবং স্ট্র্যাটেজিক হরমুজ প্রণালি এলাকায় ইরানের প্রায় ৮০টি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে স্মরণকালের ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকোম)।
মার্কিন বাহিনীর সেই বিধ্বংসী হামলার জবাব দিতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কুয়েত এবং বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে প্রথম দফায় পাল্টা আঘাত করেছিল আইআরজিসি। এই হামলা এবং পাল্টা হামলার মধ্যেই গতকাল বুধবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা সফররত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক আকস্মিক ও চরম বার্তায় ঘোষণা দেন- “ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি এখানেই শেষ এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরানের সঙ্গে কোনো ধরনের কূটনৈতিক আলোচনা বা মধ্যস্থতা অব্যাহত রাখা আর সম্ভব নয়।”
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী ও চূড়ান্ত ঘোষণার পরপরই বুধবার রাতে দ্বিতীয় দফায় ইরানের অভ্যন্তরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও হামলা চালায় সেন্টকোম। আইআরজিসি-র উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, বুধবার রাতে সেন্টকোমের চালানো সেই দ্বিতীয় দফার হামলার সরাসরি প্রতিশোধ হিসেবেই কুয়েত ও বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটিতে এই দ্বিতীয় দফার সমন্বিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এই ঘটনার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এখন এক ভয়াবহ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
Leave a comment