আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই নিজেকে “বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইহুদিবাদী রাষ্ট্রপ্রধান” হিসেবে দাবি করে ইসরায়েল এবং ইহুদি জনগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর অটল ও অকুণ্ঠ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। নিউইয়র্কের ইয়েশিভা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অত্যন্ত জোরালো ভাষণে তিনি এই চাঞ্চল্যকর ঘোষণা দেন। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত তাঁর দৃঢ় ইসরায়েলপন্থী পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সমালোচনা করা রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের কড়া জবাব দিয়েছেন এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
ইয়েশিভা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকচিহ্ন খচিত পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে মিলেই তাঁর এই বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থানের পেছনের আদর্শিক ও দার্শনিক ভিত্তি তুলে ধরেন। নিজের মূল বক্তব্য ব্যক্ত করার আগে তিনি বিখ্যাত স্বাধীনতাবাদী তাত্ত্বিক হান্স-হারমান হোপের প্রসঙ্গ টেনে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বলেন যে, তিনি ইসরায়েলের একজন কট্টর সমর্থক হওয়ায় হোপ তাঁর ওপর দারুণ বিরক্ত। মিলেইর এই নাটকীয় ঘোষণার পর উপস্থিত শ্রোতারা বিপুল করতালির মাধ্যমে তাঁকে স্বাগত জানান, যা ইহুদি রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর গভীর আদর্শিক সংযোগকে আরও সুদৃঢ় করে।
ইসরায়েলের প্রতি নিছক ভূরাজনৈতিক সমর্থনের বাইরে গিয়ে মিলেই তাঁর এই ভাষণে নিজস্ব দার্শনিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির গভীর আলোকপাত করেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির মতো আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার মূল নীতিগুলোকে ইহুদি ধর্মগ্রন্থ ‘তোরাহ’ এবং বাইবেলের ‘দশ আজ্ঞা’র সাথে সম্পর্কিত করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, মানুষের স্বাধীনতার আদি ধারণাটি বাইবেলের যাত্রাপুস্তকের (এক্সোডাস) বর্ণনার সাথে গভীরভাবে জড়িত। প্রথম আজ্ঞার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, সৃষ্টিকর্তা মানুষকে মিশরীয় দাসত্ব থেকে বের করে আনার মাধ্যমেই মূলত মানুষের স্বাধীনতা, জীবন এবং সম্পত্তির অধিকার সুনিশ্চিত করেছেন।
একজন কট্টর নৈরাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী (অ্যানার্কো-ক্যাপিটালিস্ট) নেতা হিসেবে পরিচিত হাভিয়ের মিলেই দীর্ঘদিন ধরেই ইহুদি ধর্মের প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন এবং প্রায়শই শীর্ষ রাব্বিদের (ইহুদি ধর্মীয় গুরু) কাছ থেকে আধ্যাত্মিক পরামর্শ নিয়ে থাকেন। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, বাইবেলীয় নীতিগুলো তাঁর কাছে পরম সত্য। আধুনিক দার্শনিক ধারার নৈতিক আপেক্ষিকতাবাদকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে তিনি ধর্মগ্রন্থ থেকে উদ্ভূত বস্তুনিষ্ঠ নৈতিক সত্যের পক্ষে জোরালো যুক্তি দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই পবিত্র মূল্যবোধগুলো অপরিবর্তনীয় এবং এগুলো নিয়ে কোনো আপস চলে না, কারণ এর ওপর ভিত্তি করেই মূলত আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার কীর্তি নির্মিত হয়েছে।
আর্জেন্টিনার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই হাভিয়ের মিলেই দেশটির প্রথাগত পররাষ্ট্রনীতিতে নাটকীয় ও আমূল পরিবর্তন এনেছেন। তাঁর বর্তমান প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হলো লাতিন আমেরিকার দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে আবদ্ধ করা। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসরায়েল সফর করেন, যেখানে তিনি পবিত্র ওয়েস্টার্ন ওয়ালে (পশ্চিমী দেয়াল) অশ্রুসজল চোখে প্রার্থনা করেন এবং শীর্ষ ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এছাড়া, তিনি আর্জেন্টিনার দূতাবাসকে তেল আবিব থেকে বিতর্কিত জেরুজালেমে স্থানান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন, যা ইসরায়েলের প্রতি তাঁর এই অটল সমর্থনেরই চূড়ান্ত প্রতিফলন।
Leave a comment