ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক ধস নেমেছে। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইয়ের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে এই বিস্ফোরক তথ্যটি প্রকাশ করেছে নির্বাসিত ও প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’।
রবিবার (৩১ মে) প্রেরিত ওই পদত্যাগপত্রে পেজেশকিয়ান অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত মৌলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে প্রেসিডেন্ট ও নির্বাচিত সরকারের কার্যত কোনো ভূমিকা বা অংশীদারিত্ব অবশিষ্ট নেই। এই পরিস্থিতিতে সৃষ্ট তীব্র প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে দেশটির ঐতিহ্যবাহী ও ক্ষমতাধর সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)-এর কট্টরপন্থি অংশটি রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলোর সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের একক মুঠোয় নিয়ে নিয়েছে বলে তিনি সরাসরি অভিযোগ তোলেন।
সূত্রের দাবি অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতার কাছে পাঠানো চিঠিতে পেজেশকিয়ান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন, এমন কর্তৃত্ববাদী ও হস্তক্ষেপমূলক পরিস্থিতিতে সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং জনগণের দেওয়া সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর এই যৌক্তিক কারণেই তিনি অবিলম্বে পদত্যাগের অনুমতি প্রার্থনা করেছেন।
তবে প্রেসিডেন্টের এই আকস্মিক ও সংবেদনশীল পদত্যাগপত্রটি সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চিঠির প্রতিটি শব্দ ও বিষয়বস্তু দেশটির ক্ষমতার সর্বোচ্চ অলিন্দে চলমান গভীর এবং নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের বাস্তব চিত্রটিকেই বিশ্বের সামনে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।
বিগত কয়েক মাস ধরেই ইরানের নির্বাচিত বেসামরিক সরকার এবং দেশটির শক্তিশালী সামরিক-নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা চলছিল। এর আগেও ইরান ইন্টারন্যাশনাল এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, আইআরজিসি সুকৌশলে ধীরে ধীরে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার পরিধি সীমিত করে দিচ্ছিল এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত খাতের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের করায়ত্ত করে নিচ্ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির কারণে পেজেশকিয়ানের প্রশাসন সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার মধ্যে নিপতিত হয়। ফলস্বরূপ আন্তর্জাতিক স্তরে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ার পাশাপাশি মন্ত্রিসভার কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও পুনর্গঠনের কোনো উদ্যোগই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে রাজনৈতিক এই চরম অস্থিরতার মধ্যেই একই দিনে ইরানের রাজধানী তেহরানে একটি জনাকীর্ণ ক্যাফে সিলগালা করে দিয়েছে দেশটির নীতি পুলিশ। কর্তৃপক্ষের দাবি, পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুকরণে ওই ক্যাফেটিতে তথাকথিত ‘শয়তানপন্থি কার্যক্রম’ ও বিচ্যুত আদর্শের প্রচার করা হচ্ছিল।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তেহরানের ঐতিহ্যবাহী ভ্যালিয়াসর সড়কে অবস্থিত ওই ক্যাফের ভেতরের একটি গোয়েন্দা ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, সরাসরি সঙ্গীত পরিবেশনার (লাইভ মিউজিক) সময় কঠোর ধর্মীয় বিধিনিষেধ অমান্য করে তরুণ-তরুণী ও নারী-পুরুষ একসঙ্গে টেবিলে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করছেন। প্রকাশিত ফুটেজে কয়েকজন দর্শককে হাততালি দিতে, মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করতে এবং সঙ্গীতের তালে মাথা নাড়াতে দেখা যায়।
তেহরানের জনসমাগমস্থল তদারকির দায়িত্বে থাকা পুলিশ প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যাফেটির বিরুদ্ধে ‘সামাজিক অবক্ষয়’ সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পরই এই ঝটিকা অভিযান চালানো হয়। ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একদিকে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে ক্ষমতার লড়াই, অন্যদিকে সাধারণ জনগণের ওপর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কঠোরতা বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে দেশটিতে এক চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
Leave a comment