রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক ও নৃশংস কারণ উদ্ঘাটন করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, প্রতিবেশীর বিকৃত যৌনলালসার শিকার হয়েছিল দ্বিতীয় শ্রেণির ওই স্কুলছাত্রী। পরবর্তীতে শারীরিক নির্যাতন ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার ভয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর আলামত গোপন ও মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে শিশুটির মাথা ও হাত কেটে ফেলা হয়েছিল।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাতে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম। তিনি জানান, নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে মূল অভিযুক্ত মো. জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা (৩০) ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত রিকশা মেকানিক জাকিরের বিরুদ্ধে নাটোরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আগের একটি মামলা রয়েছে।
পুলিশের তদন্ত ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত রামিসার পরিবার সংশ্লিষ্ট ভবনে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বসবাস করলেও অভিযুক্ত দম্পতি মাত্র দুই মাস আগে তাদের উল্টো দিকের ফ্ল্যাটে ভাড়া আসেন। গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খুঁজতে বের হন তার মা। একপর্যায়ে ওই ফ্ল্যাটের দরজার সামনে রামিসার স্যান্ডেল দেখতে পেয়ে তিনি দরজায় নক করতে থাকেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, রামিসার মা যখন বাইরে থেকে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ঘরের ভেতরে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডটি চালানো হচ্ছিল। মূল আসামি জাকির যেন ঘরের পেছনের জানালা দিয়ে পালাতে পারে, সেই সুযোগ করে দিতেই তার স্ত্রী স্বপ্না দীর্ঘক্ষণ দরজা খোলেননি। জাকির জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার পরই স্বপ্না দরজা খোলেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে স্বপ্না সরাসরি সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করছে পুলিশ।
ঘটনার পরপরই পুলিশ ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। তবে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়া জাকিরকে ধরতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ব্যাপক অভিযান শুরু হয়। একপর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে, জাকির নারায়ণগঞ্জের একটি বিকাশ এজেন্টের দোকানে তার বন্ধুর পাঠানো টাকা তুলতে গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট দোকানদারের সহায়তায় ডিএমপির একটি বিশেষ টিম সেখানে অভিযান চালিয়ে টাকা তোলার মুহূর্তেই জাকিরকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে।
এর আগে সকালে পল্লবীর ওই ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে শিশু রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং পরবর্তীতে বাথরুম থেকে তার খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত রামিসা স্থানীয় পপুলার স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, “প্রাথমিকভাবে আমাদের ধারণা, শিশুটির ওপর চরম বিকৃত যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণ চালানো হয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার ভয়েই অবুঝ শিশুটিকে মেরে দেহটি খণ্ড-বিখণ্ড করে গুম করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে ধর্ষণের বিষয়টি ময়নাতদন্ত পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
তিনি আরও জানান, জাকিরের স্ত্রী স্বপ্নার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী—জাকির চরম বিকৃত যৌনরুচিসম্পন্ন একজন ব্যক্তি এবং সে প্রায়শই তার স্ত্রীর ওপরও অমানুষিক নির্যাতন চালাত। বর্তমানে নিহত শিশুর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং এই বর্বরোচিত ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
Leave a comment