মানুষের পরম বন্ধু হিসেবে কুকুরের বিশ্বস্ততার কাহিনী আমরা বহুবার শুনেছি, কিন্তু ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার উদলা ব্লকের ধিরাকুলা গ্রামে যা ঘটল, তা কেবল বিশ্বস্ততা নয়, বরং এক মহাকাব্যিক আত্মত্যাগের নজির। একদল শিশুকে যমদূত সম বিষধর সাপের হাত থেকে রক্ষা করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে ‘কালী’ নামের একটি কুকুর।
ঘটনাটি ঘটে গত সোমবার সকালে। স্থানীয় শ্রী জগন্নাথ শিশু বিদ্যা মন্দিরের প্রায় ৩০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী স্কুলের বাইরে বসে ছিল। ঠিক সেই সময় একটি বিষধর সাপ শিশুদের দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসতে থাকে। উপস্থিত শিশুরা বিপদের গুরুত্ব বোঝার আগেই ‘কালী’ নামক কুকুরটি পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পারে।
মুহূর্তের মধ্যেই শিশুদের সামনে এক দুর্ভেদ্য ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে পড়ে কালী। সাপটি শিশুদের ছোবল দেওয়ার চেষ্টা করলে কালী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় এক ভয়াবহ জীবন-মরণ লড়াই। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, লড়াই চলাকালীন সাপটি বারবার কালীর শরীরে বিষাক্ত ছোবল বসাতে থাকে। কিন্তু অসহ্য যন্ত্রণা উপেক্ষা করে কালী এক চুলও নড়েনি। অবশেষে সাপটিকে মেরে ফেলে শিশুদের নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে সে।
সাপটিকে নিস্তেজ করার কয়েক মুহূর্ত পরেই বিষের তীব্রতা কালীর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। শত্রুকে পরাজিত করার তৃপ্তি নিয়েই যেন কিছুক্ষণের মধ্যে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে এই বীর প্রাণীটি। কালীর নিথর দেহ দেখে পুরো গ্রাম স্তব্ধ হয়ে যায়। স্কুলের শিক্ষক ও অভিভাবকরা জানান, কালী সময়মতো না দাঁড়ালে আজ ৩০টি পরিবারে শোকের মাতম চলত।
কালীর এই অসামান্য বীরত্বে ধিরাকুলা গ্রামবাসী শোকে ভেঙে পড়েন। তবে তারা তাদের এই ‘ত্রাতা’কে সাধারণ পশুর মতো বিদায় দেননি। গ্রামবাসীরা মিলে কালীর জন্য এক রাজকীয় শেষকৃত্যের আয়োজন করেন। হিন্দু রীতি মেনে একজন মানুষের শেষকৃত্যে যা যা করা হয়, কালীর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
ফুল এবং সাদা কাপড়ে ঢেকে কালীর মরদেহ একটি ট্রলিতে করে পুরো গ্রাম প্রদক্ষিণ করানো হয়। গ্রামবাসী ও শিশুদের অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকে পবিত্র ভূমিতে সমাধিস্থ করা হয়।
ধীরাকুলা গ্রামের বাসিন্দারা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “কালী কেবল একটি কুকুর ছিল না, সে ছিল আমাদের সন্তানদের রক্ষাকর্তা। সে নিজের জীবন দিয়ে আমাদের শিশুদের নতুন জীবন দান করেছে। তার এই ঋণ আমরা কোনোদিন শোধ করতে পারব না। আমাদের হৃদয়ে কালী চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।”
আজকের দিনে যখন স্বার্থপরতা আর হিংসা সমাজকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তখন কালীর এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভালোবাসা ও বীরত্বের কোনো প্রজাতিগত সীমা নেই।
সূত্র: আজকাল
Leave a comment