গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের ঘাটতি। দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ঘাটতি মেটাতে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে, যার বড় অংশের চাপ পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। পরিকল্পিতভাবে ঢাকাকে লোডশেডিংমুক্ত রাখার অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছর ধরেই গ্রীষ্ম মৌসুমে নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিলে শুরুতেই গ্রামে সরবরাহ কমানো হয়। ঘাটতি বাড়লে একপর্যায়ে শহরেও লোডশেডিং করা হয়, তবে তা গ্রামের তুলনায় অনেক কম।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের প্রধান সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। তাদের নির্দেশনায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন করে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ এবং ছয়টি বিতরণ সংস্থা গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয় ২ হাজার ৫০৬ মেগাওয়াট, যার মধ্যে ২ হাজার ২২৯ মেগাওয়াট ছিল পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতায়। ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল কেন্দ্রীয় হিসাবে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয় ১ হাজার ৮৯০ মেগাওয়াট, যদিও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী তা ছিল ২ হাজার ১১ মেগাওয়াট।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের তথ্য সংরক্ষণ করতে পারেনি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড। চলতি বছরের ২০ এপ্রিল ১ হাজার ৮৪০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে বলে জানায় পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি, তবে একই সময়ে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮৯৭ মেগাওয়াট।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের তথ্যই বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। কেন্দ্রীয়ভাবে চাহিদা কম দেখানোর প্রবণতা রয়েছে, ফলে প্রকৃত ঘাটতি আড়াল হয়ে যায়।
ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী প্রায় পূর্ণ সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী নর্দান ইলেকট্রিক কোম্পানি জানায়, ১৯ এপ্রিল চাহিদার তুলনায় ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকায় সীমিত লোডশেডিং করতে হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতেও তুলনামূলক কম ঘাটতি দেখা গেছে।
পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, পাশাপাশি কিছু কেন্দ্রে কয়লার সংকট রয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে এবং আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। সব বিতরণ সংস্থার মধ্যে সুষমভাবে বিদ্যুৎ বণ্টনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি নিশ্চিত না করেই অতীতে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধির কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটও জ্বালানি আমদানিতে প্রভাব ফেলছে।
বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়াতে পারে। ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৬ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে, যার ফলে দেড় থেকে ২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বিশেষ করে রাতের দিকে চাহিদা বাড়লে লোডশেডিং তীব্র হচ্ছে। এতে গ্রামাঞ্চলে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। সেচ, শিক্ষা ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
Leave a comment