Home অর্থনীতি বিহারি ক্যাম্পে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া ৭৭ কোটি টাকা
অর্থনীতি

বিহারি ক্যাম্পে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া ৭৭ কোটি টাকা

Share
Share

রংপুর ও নীলফামারীর সৈয়দপুরের বিহারি ক্যাম্পগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যবহার হলেও কোটি কোটি টাকার বিল কে পরিশোধ করবে—তার কোনো স্পষ্টতা নেই। বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা বকেয়া বিল এখন প্রায় ৭৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এতে বিদ্যুৎ বিভাগে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রতি মাসে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হলেও এখনো কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।

নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) সূত্রে জানা গেছে, রংপুর ও সৈয়দপুরের বিভিন্ন বিহারি ক্যাম্পে সরকারিভাবে স্থাপিত ২৬টি বিদ্যুৎ মিটার রয়েছে। এর মধ্যে রংপুরে ২টি এবং সৈয়দপুরে ২৪টি। দীর্ঘদিন বিল পরিশোধ না হওয়ায় বকেয়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রংপুরে বকেয়া ১০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং সৈয়দপুরে ৬৬ কোটি ৬ লাখ টাকা।

সূত্র জানায়, রংপুরের দুটি মিটার থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১২ লাখ টাকা এবং সৈয়দপুরের ২৪টি মিটার থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে কয়েকটি ক্যাম্পে গিয়ে দেখা গেছে, সরকারি মিটার থাকা সত্ত্বেও সরাসরি লাইন থেকে অবৈধ সংযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। অতিরিক্ত চাপের কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া বা অগ্নিকাণ্ড এড়াতে এসব সংযোগে সার্বক্ষণিক পাখা চালিয়ে রাখা হয়। ফলে সরকারি মিটারের বাইরেও অসংখ্য অনিয়ন্ত্রিত সংযোগ রয়েছে।

রংপুরের রবার্টসনগঞ্জের ঘিঞ্জি বিহারি ক্যাম্পে সরু গলিতে ছোট ছোট টিনের ঘর দেখা যায়। একটি ছোট কক্ষে তিনজন থেকে শুরু করে শিশুদেরসহ চার-পাঁচজনের বসবাস। বেশিরভাগ ঘরে একটি পাখা, একটি বাল্ব এবং মোবাইল চার্জের সংযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও এলইডি টেলিভিশন ও ফ্রিজও দেখা গেছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব সংযোগের কোনো বৈধ মিটার নেই।

পাশের খুঁটি থেকে একাধিক লাইন টেনে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হয়েছে। একই চিত্র রংপুর ও সৈয়দপুরের অন্যান্য বিহারি ক্যাম্পেও। কোথাও এক লাইনে বহু পরিবার, কোথাও মিটারবিহীন সংযোগ, আবার কোথাও ঝুলন্ত তারে ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবহার চলছে।

ক্যাম্পের বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই এভাবেই বিদ্যুৎ ব্যবহার চলছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, একসময় এসব ক্যাম্পের বিদ্যুৎ বিল ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় পরিশোধ করত। কিন্তু নাগরিকত্ব স্বীকৃতির পর ধীরে ধীরে সেই ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বকেয়া বাড়তেই থাকে।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ১৮ মে হাইকোর্টের এক রায়ে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং তাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তবে ক্যাম্পবাসীরা জানান, নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পেলেও তারা এখনো অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

রংপুরের রবার্টসনগঞ্জ বিহারি ক্যাম্পের এক বাসিন্দা (ছদ্মনাম মোকলেছুর রহমান) বলেন, “আমাদের এখানে সরকারি লাইনও আছে, আবার সরাসরি সংযোগও আছে। যে যত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, সে অনুযায়ী স্থানীয় একজনকে টাকা দেয়। কেউ ৩০ টাকা, কেউ ১০০ টাকা দেয়। তবে আমরা বিদ্যুৎ বিভাগকে সরাসরি টাকা দিই না।”

কেন সরাসরি বিদ্যুৎ বিভাগকে টাকা দেওয়া হয় না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সংযোগের তার মেরামতসহ বিভিন্ন কাজের জন্যই এই টাকা নেওয়া হয়।”

সৈয়দপুরের একটি ক্যাম্পের বাসিন্দা (ছদ্মনাম শাহীন) বলেন, “আমরা মাসে কিছু টাকা দিই, কিন্তু তা বিদ্যুৎ অফিসে যায় কি না জানি না। নিজের নামে মিটার নেওয়ার সুযোগও পাই না।”

বর্তমান পরিস্থিতিতে দায় কার—তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দায় এড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে, কিন্তু বিল পাচ্ছে না। অন্যদিকে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ও বিল পরিশোধ করছে না।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রিপেইড মিটার স্থাপন এবং পরিবারভিত্তিক আলাদা সংযোগ প্রদান করলে সমস্যার সমাধান সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ও নীতিগত সিদ্ধান্ত।

নেসকোর রংপুর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, “আমরা নিয়মিত ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাচ্ছি। প্রতি মাসেই বকেয়া বিল পরিশোধের অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি।”

সৈয়দপুর ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাজিদ ইকবাল বলেন, “আমরা বিনামূল্যে বিদ্যুৎ চাই না, বিল পরিশোধ করতে চাই। আমাদের সম্মানজনক পুনর্বাসন করা হলে এই সমস্যা সমাধান হবে।”

তিনি আরও বলেন, আগে বিভিন্ন দাতা সংস্থার সহায়তায় সরকার বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করত। বর্তমানে সেই সহায়তা বন্ধ হয়ে গেছে। ক্যাম্পে আগে ত্রাণসহ নানা সুবিধা পাওয়া গেলেও এখন তা নেই।

তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকলে শিশুদের পড়াশোনা ব্যাহত হবে, আর ঘিঞ্জি পরিবেশে তাপদাহে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে। আমাদের সাত দফা দাবি রয়েছে—সেগুলোর বাস্তবায়ন চাই। পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”

মানবাধিকারকর্মী আহসানুল আরেফিন বলেন, সমস্যার মূল কারণ পরিকল্পনার অভাব। ক্যাম্পগুলোকে নগর কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত না করায় বিদ্যুৎ সংযোগও অনানুষ্ঠানিক রয়ে গেছে। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে বাসিন্দারা ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে।

তিনি বলেন, সমাধানের জন্য পরিবারভিত্তিক পৃথক মিটার স্থাপন এবং সরকারিভাবে পুনর্বাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

ব্যাংক হিসাব খুলতে ও চালু রাখতে বাধ্যতামূলক হচ্ছে টিআইএন

করের আওতা বাড়াতে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করছে সরকার। একই সঙ্গে বিদ্যমান ব্যাংক হিসাব সচল রাখতেও...

দক্ষিণ সুরমা প্রেসক্লাব ভবন নির্মাণের বিষয় সংসদে উত্থাপন, এমপি এম এ মালিককে দক্ষিণ সুরমা প্রেসক্লাবের ধন্যবাদ

জাতীয় সংসদে দক্ষিণ সুরমা প্রেসক্লাবের ভবন নির্মাণের বিষয়টি উত্থাপন করায় সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম এ মালিককে ধন্যবাদ জানিয়েছে দক্ষিণ সুরমা প্রেসক্লাব। এক...

Related Articles

শেয়ারবাজারের ‘ডাস্টবিনে’ রহস্যময় লেনদেন, আলোচনায় হিরু-সাকিবের কোম্পানি

শেয়ারবাজারের ওভার-দ্য-কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটকে দীর্ঘদিন ধরেই ‘ডাস্টবিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কারণ,...

চাকরির স্বপ্ন অপূর্ণ, উদ্যোক্তা হয়ে সফল মাহমুদা খুশি

মো. গোলাম কিবরিয়া রাজশাহী প্রতিনিধি রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার একটি সাধারণ গ্রামে বেড়ে...

নিউজিল্যান্ডের কাছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ ও চামড়াজাত পণ্য আমদানি বাড়ানোর আহ্বান

রাজধানীর খাদ্য মন্ত্রণালয়ে রোববার খাদ্য ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারীর সঙ্গে...

নতুন বাজেটে নিত্যপণ্যে বাড়তি করের আশঙ্কা, বাড়তে পারে জনভোগান্তি

কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে...