ক্ষমতার দেড় মাসের মধ্যেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করেছে সরকার। এই সময়েই কেবল ব্যাংক থেকেই নেওয়া হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। আর অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বাধীন সময়ে শেষ তিন মাসে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকায়। মূলত রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি পূরণ করতেই এই ঋণ নির্ভরতা বাড়ছে বলে জানা গেছে। ফলে মাত্র নয় মাসেই ব্যাংক ঋণ পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ১৪ মাসে ব্যাংক ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে স্থবির অর্থনীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির দুর্বল গতির কারণে সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি হারিয়েছে দেশ।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে কেনাকাটার প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আহরণে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৭১ হাজার কোটি টাকা। আয় কমলেও সরকারের ব্যয় কমেনি, বরং বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এই পরিস্থিতিতে পরিচালন ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাত থেকেই বড় আকারে ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে। অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা, যা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়েই নেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা, যা আগের ছয় মাসের তুলনায় বেশি।
বিশেষভাবে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে নেওয়া প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকার ঋণই সরকারের ঋণ গ্রহণের তীব্রতা নির্দেশ করে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এমন ধারাবাহিক ঋণ নির্ভরতা ভবিষ্যতে ঋণফাঁদের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আমরা যাতে কোনোভাবেই ঋণ ফাঁদের মধ্যে না পড়ি, সেটাই সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। এখন জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে ব্যয় সামাল দিতে ঋণ নিতে হচ্ছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করা।”
অন্যদিকে, শেষ তিন মাসে সরকারের ঋণ গ্রহণ ‘অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এভাবে ধারাবাহিকভাবে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে অর্থপ্রবাহ কমে যেতে পারে, যা বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সরকার যদি ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তা শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তার মতে, এই ঋণের বোঝা ভবিষ্যতে পরিশোধের ক্ষেত্রে সরকারের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে তীব্র তারল্য সংকট চলছে। নতুন নীতিমালার কারণে অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না। তার মতে, বহু ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি থাকায় বেসরকারি খাতের অর্থায়ন আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা। এর বড় অংশই নেওয়া হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, রাজস্ব ঘাটতি ও উচ্চ সরকারি ব্যয়ের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে চাপ আরও বাড়তে পারে।
Leave a comment