Home আন্তর্জাতিক লেবাননে ইসরায়েলি হামলার পর শান্তি আলোচনা ‘অযৌক্তিক’ : ইরান
আন্তর্জাতিক

লেবাননে ইসরায়েলি হামলার পর শান্তি আলোচনা ‘অযৌক্তিক’ : ইরান

Share
Share

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের ধোঁয়া এখনও কাটেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার রেশ কাটতে না কাটতেই লেবাননের মাটিতে ইসরায়েলি বাহিনীর ভয়াবহ বিমান হামলা পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। লেবাননে একদিনে আড়াইশ’র বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় ইরান কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের স্থায়ী শান্তি চুক্তি বা আলোচনায় বসা এখন সম্পূর্ণ ‘অযৌক্তিক’।

আগামী শনিবার থেকে বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তার স্থায়িত্ব নিয়ে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ই যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করছে। কালিবাফের মতে, ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালিয়ে ইসরায়েল যেমন উসকানি দিচ্ছে, তেমনি ওয়াশিংটনও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একতরফা চাপ তৈরি করে আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করছে।

তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “যখন আমাদের মিত্রদের ওপর বোমা বর্ষণ করা হচ্ছে, তখন দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা সমঝোতার কোনো অর্থ হয় না।”

এবারের সংকটের মূলে রয়েছে যুদ্ধবিরতির পরিধি নিয়ে অস্পষ্টতা। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ইরানের সঙ্গে আলোচনার প্রধান প্রতিনিধি জে ডি ভ্যান্স বুদাপেস্টে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি মূলত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সরাসরি সংঘাত থামানোর জন্য, এতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। ভ্যান্সের এই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা গেছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কণ্ঠেও। নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেছেন যে, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের অভিযান থামবে না এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ‘ট্রিগারে আঙুল’ রেখে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান মনে করেছিল লেবাননও এই যুদ্ধবিরতির অংশ হবে। এই কৌশলগত ভুল বোঝাবুঝি এখন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। লেবাননের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, বৈরুতসহ বিভিন্ন শহরে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২৫৪ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে বড় একটি অংশই সাধারণ নাগরিক। কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই জনবহুল এলাকায় এই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ভুক্তভোগীরা।

যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ভাষ্য সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে এবং মজুত করা ইউরেনিয়াম ওয়াশিংটনের হাতে তুলে দিতে সম্মত হয়েছে। ট্রাম্পের চিরাচরিত নাটকীয় ভঙ্গিতে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “ইরানের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র মাটির অনেক নিচে চাপা থাকা পারমাণবিক ‘ধূলিকণা’ সরিয়ে ফেলবে।”

তবে তেহরান এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। কালিবাফ জানিয়েছেন, বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী ইরান তাদের গবেষণার প্রয়োজনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখার অধিকার রাখে। এই বৈপরীত্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, শান্তি আলোচনা শুরুর পূর্বেই তা বড় ধরনের হোঁচট খেতে পারে।

যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও বিশ্ব অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারে নেমে এসেছে, যা যুদ্ধের উত্তাল সময়ের চেয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ কম। তবে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম এখনও প্রাক-যুদ্ধ পরিস্থিতির চেয়ে ২৫ ডলার উপরে অবস্থান করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সংঘাত ইরানকে একটি কৌশলগত বিজয় এনে দিয়েছে। তেহরান বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, তারা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সত্ত্বেও ইরানের এই সক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি এখনও সাধারণ নৌযানের জন্য অনিরাপদ। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) নৌ-মাইন এড়িয়ে চলার জন্য একটি বিকল্প ম্যাপ প্রকাশ করলেও জাহাজ পরিচালনাকারীরা এখনও চূড়ান্ত ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে।

শান্তি আলোচনার স্থবিরতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বশক্তিগুলো। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ লেবাননে ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, লেবাননকে বাদ দিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদী শান্তি সম্ভব নয়। জাপান, কানাডা এবং ১৩টি ইউরোপীয় দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে দ্রুত সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে যাতে একটি ভয়াবহ বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এড়ানো যায়।

এদিকে, সৌদি আরবের তেলের পাইপলাইনে হামলার খবর এবং কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ড্রোন হামলার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। রিয়াদ দাবি করছে, ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো হরমুজ প্রণালিকে পাশ কাটিয়ে তেল সরবরাহের বিকল্প পথগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তড়িঘড়ি করে একটি বড় চুক্তির কৃতিত্ব নিতে চাইলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিকে ইসরায়েলের কঠোর সামরিক অবস্থান, অন্যদিকে হিজবুল্লাহর পাল্টা রকেট হামলা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। শনিবারের প্রস্তাবিত শান্তি আলোচনা যদি শেষ পর্যন্ত শুরুও হয়, তবে তা কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন চিহ্ন থেকেই যাচ্ছে।

নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের নিরিখে বলা যায়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অবিশ্বাসের দেয়াল এতটাই চওড়া যে, সামান্যতম উসকানিও পুরো অঞ্চলকে আবারও এক মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আগামী ৪৮ ঘণ্টা হবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

শ্বশুরবাড়িতে নাশতা কম দেওয়া নিয়ে বিরোধ, মারধরের ৯ দিন পর অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যু

চট্টগ্রামের পটিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে হাতে তৈরি নাশতা কম দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে মারধরের শিকার হওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর। সিফাতুন নুর (২২)...

দুই বছরের সাজা এড়াতে চার বছর পলাতক, অবশেষে গ্রেপ্তার

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় দুই বছরের কারাদণ্ড এড়াতে চার বছর ধরে পলাতক থাকা মো. মাসুদ ওরফে মাছুমকে (৩৮) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ...

Related Articles

যুক্তরাজ্যের ৪টি পারমাণবিক সাবমেরিনের ৩টিই এখন সাগরে

  যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম চারটি সাবমেরিনের মধ্যে তিনটি বর্তমানে সাগরে...

হুথিদের হামলা বন্ধে ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রস্তাব সৌদি আরবের

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলা বন্ধ এবং যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে ইরানের মাধ্যমে গোষ্ঠীটিকে...

‘এমন দুর্নীতিগ্রস্ত প্রেসিডেন্ট আগে দেখিনি’: ট্রাম্পকে তীব্র আক্রমণ ওবামার

যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র ১০ দিন আগে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক...

১৬ কেজির বেশি ওজনের সোনার দুল তৈরি করে জোড়া বিশ্বরেকর্ড গড়ল জুয়ালুক্কাস

দুবাইয়ে ১৬ কেজিরও অধিক ওজনে এক জোড়া চোখ ধাঁধানো সোনার কানের দুল...

;