মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বড় পরিবর্তন ঘটেছে। দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্ব সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ধারাবাহিকতা রক্ষা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি তেহরানের শক্ত রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে।
আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্র এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগে থেকেই মোজতবা খামেনিকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে উল্লেখ করেছিলেন। সেই অবস্থানের বিপরীতে ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের এই সিদ্ধান্তকে ওয়াশিংটনের প্রতি সরাসরি অগ্রাহ্যতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।এমন এক সময় এই পরিবর্তন এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার খবর সামনে এসেছে। সেই ঘটনার পর শুরু হওয়া সংঘাত ইতোমধ্যে দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞ পরিষদের সিদ্ধান্ত- ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ—যারা দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে নির্বাচন করে—মোজতবা খামেনিকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর বাবার উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তেহরানে কট্টরপন্থী শক্তির প্রভাব আরও দৃঢ় হয়েছে ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেতৃত্বের এই পরিবর্তন ইরানের চলমান যুদ্ধ ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, “মোজতবাকে ক্ষমতায় আনা মূলত পুরোনো কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি।”
তিনি আরও বলেন, “এত বড় সামরিক অভিযান চালিয়ে এবং এত ঝুঁকি নিয়ে একজন প্রবীণ নেতাকে হত্যা করা—আর তারপর তাঁর জায়গায় তাঁরই কট্টরপন্থী ছেলেকে দেখতে পাওয়া—এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।”
ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু- ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক কৌশল, পারমাণবিক কর্মসূচি—সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাঁর হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকে। দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট থাকলেও তারা মূলত সর্বোচ্চ নেতার নীতিগত নির্দেশনার অধীনেই কাজ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা খামেনিকে বেছে নেওয়ার পেছনে কেবল রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, বরং বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির বাস্তবতাও বড় ভূমিকা রেখেছে। মোজতবার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ফলে তাঁর নেতৃত্বকে অনেকেই প্রতিশোধপরায়ণ ও কঠোর নীতির প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, “এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তেহরান পরিষ্কার করে দিয়েছে—তারা নিজেদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করবে না।”
অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে নতুন নেতা- ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গেই মোজতবা খামেনি নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইরানের অভ্যন্তরে কয়েক মাস ধরেই রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে, যা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি বলে বিবেচিত হচ্ছে।
দেশটির অর্থনীতি ইতোমধ্যেই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বেকারত্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য বৃদ্ধি এবং সামাজিক অসন্তোষও বাড়ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এসব চাপ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, মোজতবার নেতৃত্বে সরকার অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করতে পারে। এর মধ্যে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ক্ষমতা বাড়ানো এবং ভিন্নমত দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একটি আঞ্চলিক সূত্রের ভাষায়, “বিশ্ব হয়তো তাঁর বাবার সময়কে মিস করবে। মোজতবার সামনে কঠোর হওয়ার বিকল্প খুব কম।”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও কঠিন- মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো পল সালেম বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় আসা কোনো নেতা সহজে কূটনৈতিক সমঝোতার পথে হাঁটতে পারবেন না।”
তিনি মনে করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নতুন নেতৃত্ব সাধারণত কঠোর অবস্থানই নেয়, যাতে অভ্যন্তরীণ সমর্থন ধরে রাখা যায়। ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে “বড় শয়তান” হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছে। ফলে বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সেই বক্তব্য আরও জোরালো হতে পারে।
নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ইতোমধ্যে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এবং তাঁকে শিয়া ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ইমাম হোসেনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
আইআরজিসির প্রভাব- মোজতবা খামেনির রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও প্রায়ই উল্লেখ করা হয়।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান এয়ারের মতে, মোজতবা তাঁর বাবার চেয়েও বেশি কঠোর নেতা হতে পারেন।
তিনি বলেন, “মোজতবা বিপ্লবী গার্ডের অনেক সদস্যের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তি।” আইআরজিসি ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি শক্তি। দেশের অর্থনীতি থেকে শুরু করে নিরাপত্তা নীতিতেও তাদের বড় ভূমিকা রয়েছে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, নতুন নেতৃত্বে এই বাহিনীর প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
সম্ভাব্য ঝুঁকি ও হুমকি-তবে নতুন নেতৃত্বের সামনে বড় ধরনের ঝুঁকিও রয়েছে।ইসরায়েল ইতোমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির যেকোনো উত্তরসূরিকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, যুদ্ধ তখনই শেষ হবে যখন ইরানের সামরিক নেতৃত্ব এবং শাসক শ্রেণিকে সম্পূর্ণভাবে দুর্বল করা সম্ভব হবে।এই অবস্থায় মোজতবা খামেনির নেতৃত্ব শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক চাপ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
সংস্কারপন্থীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব- মোজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরোধী হিসেবে পরিচিত।
সংস্কারপন্থীরা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে অবস্থান নেয়। কিন্তু মোজতবা বরাবরই সেই অবস্থানের সমালোচক।
উচ্চপদস্থ ধর্মীয় নেতা এবং আইআরজিসির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তাঁকে দেশের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করেছে।অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগেও তিনি কার্যত ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রভাব বিস্তার করতেন।
আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার-মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরান এমন সময় নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করল, যখন দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের মুখে।
সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাল্টা হিসেবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দাবি। এই পরিস্থিতি পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরান আরও কট্টর অবস্থানের দিকে এগোতে পারে।পল সালেম বর্তমান পরিস্থিতিকে অতীতের কিছু সংঘাতপূর্ণ রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, ১৯৯১ সালে সাদ্দাম হোসেনের ইরাক বা ২০১২ সালের সিরিয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, “দেশের ভেতরের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল। রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট এবং যুদ্ধ—সব মিলিয়ে সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।”
তবে অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার দৃঢ়তা এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী ভূমিকা সরকারের টিকে থাকার সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দিতে পারে।এই প্রেক্ষাপটে মোজতবা খামেনির নেতৃত্ব শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করতে পারে।
Leave a comment