বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) মিনিটম্যান-৩-এর একটি পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রকে বিশ্লেষকদের অনেকে ‘ডুমসডে মিসাইল’ বা পৃথিবী ধ্বংসাত্মক অস্ত্র হিসেবেও আখ্যায়িত করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার ফোর্স গ্লোবাল স্ট্রাইক কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মঙ্গলবার (৩ মার্চ) ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যানডেনবার্গ স্পেস ফোর্স বেস থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটির পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করা হয়। পরীক্ষার সময় এতে দুটি পরীক্ষামূলক রি-এন্ট্রি ভেহিকল সংযুক্ত ছিল, যা মহাকাশ থেকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ করে নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই পরীক্ষাটি বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। বরং বহু বছর আগে থেকেই এটি পরিকল্পনার অংশ ছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের একটি তথ্যনির্ভর কর্মসূচির অংশ। গত কয়েক দশকে একই ধরনের ৩০০টিরও বেশি পরীক্ষা পরিচালিত হয়েছে। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে অস্ত্র ব্যবস্থার নির্ভুলতা, কার্যকারিতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই করা হয়। সামরিক কর্মকর্তারা বলেন, নিয়মিত এই পরীক্ষাগুলো থেকে সংগৃহীত তথ্য বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরীক্ষার সময় ক্ষেপণাস্ত্রটির দুটি রি-এন্ট্রি ভেহিকল হাজার হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে প্রশান্ত মহাসাগরের মার্শাল দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত কোয়াজালেইন অ্যাটলের নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সূত্র জানায়, দীর্ঘপাল্লার এই উড্ডয়নের মাধ্যমে ৩৭৭তম টেস্ট অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন গ্রুপের প্রকৌশলী ও অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা ক্ষেপণাস্ত্রটির নির্ভুলতা ও নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছেন।
মিনিটম্যান-৩ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি একটি পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা মার্ক-২১ উচ্চ-নির্ভুল রি-এন্ট্রি ভেহিকল দ্বারা সজ্জিত।
এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে তাত্ত্বিকভাবে পৃথিবীর যেকোনো স্থানে এটি আঘাত হানতে সক্ষম। এটি যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র স্থলভিত্তিক, সাইলো-নির্ভর, নন-মোবাইল পারমাণবিক সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবেও এটি পরিচিত।
প্রযুক্তিগতভাবে মিনিটম্যান-৩ ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে তিনটি স্বতন্ত্র পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে পারে। এই ওয়ারহেডগুলো লক্ষ্যবস্তুর দিকে যাওয়ার আগে ভিন্ন ভিন্ন পথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক পৃথক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাস সংক্রান্ত চুক্তির কারণে বর্তমানে প্রতিটি মিনিটম্যান-৩ ক্ষেপণাস্ত্রে সাধারণত একটি করে ওয়ারহেড রাখা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ব্যাপক ধ্বংসক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারে, কারণ একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকেই একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব।
বিশ্ব সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মিনিটম্যান-৩-কে ‘ডুমসডে’ বা ধ্বংসাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন। কারণ এটি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম এবং দীর্ঘপাল্লার হওয়ায় পৃথিবীর প্রায় যেকোনো অঞ্চলে আঘাত হানতে পারে।
এদিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে পরীক্ষাটি নিয়মিত সামরিক কর্মসূচির অংশ এবং বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় করা হয়নি, তবুও অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন—বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা সামরিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে এমন পরীক্ষাগুলো বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
সূত্র: এনডিটিভি
Leave a comment