লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের অভ্যন্তরে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। সোমবার (২ মার্চ) ভোরে চালানো এই হামলার মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে বলে আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
গোষ্ঠীটি এক বিবৃতিতে জানায়, ইরানে সাম্প্রতিক হামলা এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতাকে লক্ষ্য করে কথিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই তারা এ পদক্ষেপ নিয়েছে। হিজবুল্লাহ দাবি করে, এটি শুধু প্রতিশোধ নয়; বরং লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ধারাবাহিক লঙ্ঘনের জবাব।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানায়, এই হামলা ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। যুদ্ধবিরতির পরও সীমান্ত এলাকায় ছিটেফোঁটা সংঘর্ষ চলছিল।
হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিল, ইসরায়েল লেবাননের ভূখণ্ডে তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। তবে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার কথা বলেছিল। সোমবারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সেই অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে সীমান্ত সংঘাত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পড়বে।
লেবাননের রাজনৈতিক অঙ্গনেও এ হামলা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম হিজবুল্লাহর রকেট হামলাকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সন্দেহজনক’ আখ্যা দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ লেবাননের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং ইসরায়েলকে সামরিক আগ্রাসন অব্যাহত রাখার অজুহাত তৈরি করছে।
তিনি আরও সতর্ক করেন, “দেশকে আমরা নতুন কোনো দুঃসাহসিক অভিযানে জড়িয়ে পড়তে দেব না। হামলার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং নাগরিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, লেবানন সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় এবং আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে উত্তেজনা নতুন নয়। তবে ইরান–ইসরায়েল দ্বন্দ্ব সরাসরি এই সংঘাতে যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত। ফলে তেহরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপ বা রাজনৈতিক আঘাত এলে গোষ্ঠীটি প্রতিক্রিয়া দেখাবে—এমন আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ইরানে হামলা এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা এখন লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে নতুন করে বিস্ফোরিত হলো।আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকতে পারে। কিন্তু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি সরাসরি সম্পৃক্ত হলে তা বড় আকারের সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার খবরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন কূটনৈতিক মহল থেকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পাল্টা হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার না হলে সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে।
বর্তমান সংকটের সমাধান নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর—ইসরায়েলের পাল্টা পদক্ষেপ, লেবানন সরকারের অবস্থান, এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার উদ্যোগ।
যুদ্ধবিরতি পুনর্বহাল সম্ভব হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে স্পষ্ট যে, সোমবারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক দিনের সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর।
Leave a comment