মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক উপহার দিয়েছেন ভেনেজুয়েলার প্রভাবশালী বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। এই অপ্রত্যাশিত ও প্রতীকী পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং একই সঙ্গে আইনি ও নৈতিক প্রশ্নও সামনে এনেছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ফ্লোরিডায় ট্রাম্প ও মাচাদোর মধ্যে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই পদকটি উপহার দেওয়া হয়। বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, এটি ছিল দুই নেতার মধ্যে প্রথম সরাসরি ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী মধ্যাহ্নভোজ বৈঠকে ভেনেজুয়েলার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দেশটির সাম্প্রতিক ক্ষমতার পালাবদল, গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মাচাদো বলেন, ভেনেজুয়েলার জনগণের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘দৃঢ় অবস্থান ও প্রতিশ্রুতি’র স্বীকৃতি হিসেবেই তিনি নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারের মেডেলটি উপহার দিয়েছেন। তার ভাষায়, “এই পদক শুধু আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি ভেনেজুয়েলার জনগণের সংগ্রামের প্রতীক। সেই সংগ্রামে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেই আমি এটি ট্রাম্পকে উৎসর্গ করেছি।”
তবে এই উপহারকে ঘিরে দ্রুতই আইনি ও নৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। নরওয়ের নোবেল ইনস্টিটিউট স্পষ্ট করে জানিয়েছে, নোবেল শান্তি পুরস্কার একটি ব্যক্তিগত সম্মান, যা কোনোভাবেই অন্যের কাছে হস্তান্তর, ভাগাভাগি বা বিক্রি করা যায় না। অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক নথিতে পদকটি মাচাদোর নামেই নিবন্ধিত থাকবে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প আদৌ পদকটি গ্রহণ করেছেন কি না, অথবা এটি হোয়াইট হাউসের কোনো আনুষ্ঠানিক সংগ্রহে রাখা হবে কি না—সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, মাচাদোর এই পদক্ষেপ কেবল সৌজন্য বিনিময় নয়; বরং এটি ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই উপহার দেওয়া হলো, যখন চলতি মাসেই মার্কিন বাহিনীর একটি বিশেষ অভিযানে ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের শাসক নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। এই ঘটনার পর দেশটিতে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং নতুন নেতৃত্ব কে হবেন—তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা চলছে।
মাচাদো নিজেকে ভেনেজুয়েলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মুখ হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, ট্রাম্প এই বৈঠককে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও মাচাদোর এককভাবে দেশ পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত জনসমর্থন ও রাজনৈতিক শক্তি বর্তমানে আছে কি না—তা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে পর্যালোচনা চলছে।
তিনি বলেন, “ভেনেজুয়েলায় গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সমর্থন দেওয়ার আগে আমরা মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও রাজনৈতিক ভারসাম্য বিবেচনা করছি।”
ফ্লোরিডার বৈঠকের পর মাচাদো ওয়াশিংটন ডিসিতে ক্যাপিটল হিলে যান। সেখানে তিনি রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের প্রভাবশালী সিনেটরদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে তিনি ভেনেজুয়েলার বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং দ্রুত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি জানান, মাচাদো তাদের সতর্ক করে বলেছেন—মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হলেও ভেনেজুয়েলায় এখনো দমন-পীড়নের পরিবেশ পুরোপুরি কাটেনি। তার আশঙ্কা, দ্রুত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা না হলে দেশটি আবারও অস্থিরতার দিকে ফিরে যেতে পারে।
Leave a comment